মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মধ্যকার এক অস্বস্তিকর ও গভীর বৈপরীত্য আবারও বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত হয়েছে। ইরানের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ‘নোবিটেক্স’ (Nobitex) ট্রন এবং বিএনবি চেইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কমপক্ষে ২৩০ কোটি (২.৩ বিলিয়ন) ডলারের বিশাল লেনদেন সম্পন্ন করেছে।
মজার এবং বিতর্কিত বিষয় হলো—এই দুটি শীর্ষ ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতারা আবার ট্রাম্পের পারিবারিক ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ (World Liberty Financial)-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও অর্থায়নকারী। বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে ট্রন ও বিএনবি চেইনের গতিশীল ডিজিটাল লেজার ব্যবহার করে নোবিটেক্স এই বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন করেছে। ক্রিপ্টো ধনকুবের জাস্টিন সান (Tron-এর প্রতিষ্ঠাতা) ও চ্যাংপেং ঝাওয়ের (BNB Chain বা Binance-এর প্রতিষ্ঠাতা) হাত ধরে এই নেটওয়ার্কগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় ‘আইরনি’ বা ভাগ্যের পরিহাস হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধ চলাকালীনও এই নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহার করে ইরানি অর্থ অবাধে স্থানান্তরিত হয়েছে, যার বিনিময়ে ট্রন ও বিএনবি চেইনকে নিয়মিত ট্রানজেকশন ফি দিতে হয়েছে।
অন্যদিকে, জাস্টিন সান এবং চ্যাংপেং ঝাও উভয়েই ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ফার্ম ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এর শীর্ষ আর্থিক সমর্থক। যদিও ট্রন বা বিএনবি চেইনকে যে নোবিটেক্স ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প পরিবার আগে থেকে জানত—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি; তবুও এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (SEC) ইন্টারনেট এনফোর্সমেন্ট বিভাগের সাবেক প্রধান জন রিড স্টার্ক এই ঘটনাকে ‘নাটকীয় পরিহাস’ বলে উল্লেখ করে বলেন:
"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধে যাদের পরাজিত করতে চাচ্ছেন, ঠিক সেই শত্রু পক্ষগুলোই এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে ক্রিপ্টো অর্থায়ন ও লেনদেন সম্পন্ন করছে, যা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসাকে সমৃদ্ধ করছে।"
ক্রিপ্টো অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘আরখাম’ (Arkham)-এর ডেটা বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নোবিটেক্স ট্রন নেটওয়ার্কে ২০০ কোটি ডলার এবং বিএনবি চেইনে ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের লেনদেন করেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিএনবি চেইনের মাধ্যমে অন্তত ২ কোটি ২৬ লাখ ডলার এবং ট্রনের মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ নোবিটেক্সের হাত ঘুরে এসেছে।
+-----------------------------------+--------------------------------------------------+
| নেটওয়ার্কের নাম | নোবিটেক্সের মোট লেনদেন (২০২৩ থেকে বর্তমান) |
+-----------------------------------+--------------------------------------------------+
| ট্রন (Tron Network) | ২০০ কোটি ডলার ($২ Billion) |
+-----------------------------------+--------------------------------------------------+
| বিএনবি চেইন (BNB Chain) | ৩১ কোটি ৭০ লাখ ডলার ($৩১৭ Million) |
+-----------------------------------+--------------------------------------------------+
| যুদ্ধ শুরুর পর লেনদেন (BNB) | ২ কোটি ২৬ লাখ ডলার |
+-----------------------------------+--------------------------------------------------+
গত ১ মে রয়টার্সের অপর এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল যে, নোবিটেক্স মূলত ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী পরিবারের দুই ভাইয়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই এক্সচেঞ্জটি পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের একটি সমান্তরাল বা ছায়া আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় হাব হিসেবে কাজ করছে। এর ব্যবহারকারীদের মধ্যে খোদ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-ও রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়া ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ট্রন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ৫০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের ‘টেথার’ (USDT) নামক স্টেবলকয়েন কিনেছিল, যার বড় অংশ পরবর্তীতে নোবিটেক্স এক্সচেঞ্জে পাঠানো হয়। যদিও ইসরাইলের অনুরোধে টেথার কোম্পানি নোবিটেক্সের সাথে যুক্ত বেশ কয়েকটি ওয়ালেট ব্লক করেছে, তবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ কেন নোবিটেক্সের বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, তা এখনো রহস্যে ঘেরা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন ট্রাম্প পরিবারসহ জাস্টিন সান এবং চ্যাংপেং ঝাওয়ের ভাগ্য রাতারাতি বদলে দিয়েছে:
জাস্টিন সানের উদ্ধারকর্তা ইমেজ: ২০২৪ সালের অক্টোবরে ট্রাম্পের ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি’ যখন চরম বিনিয়োগকারী সংকটে ভুগছিল, তখন জাস্টিন সান কোম্পানিটির লাখ লাখ ডলারের ‘ডব্লিউএলএফআই’ (WLFI) টোকেন কিনে এর পতন ঠেকান। বর্তমানে ট্রাম্পের প্ল্যাটফর্মে সানের বিনিয়োগের বাজারমূল্য প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর বিনিময়ে সানের বিরুদ্ধে চলা মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার জালিয়াতির একটি মামলা গত মার্চে মাত্র ১ কোটি ডলার জরিমানার বিনিময়ে রফা করা হয়।
চ্যাংপেং ঝাও-এর ক্ষমা প্রদর্শন: সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাইনান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাওকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতি ক্ষমা (Presidential Pardon) করে দেন, যার ফলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায়ে পাওয়া ফেডারেল সাজা থেকে মুক্তি পান ঝাও। বর্তমানে ট্রাম্পের টোকেনটিকে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে সচল রাখতে বাইনান্স প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার সমমূল্যের ট্রাম্প টোকেন নিজেদের হেফাজতে রেখেছে।
অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর বাণিজ্যিক সংস্থা এই স্বার্থের সংঘাতের (Conflict of Interest) অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি রয়টার্সকে বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের ব্যাংকিং ব্যবস্থার যোগসূত্র খোঁজার এই অদ্ভুত ও মনগড়া চেষ্টা সম্পূর্ণ হাস্যকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।"
অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড লিবার্টির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, নোবিটেক্সের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা শতভাগ মার্কিন আইন মেনেই তাদের গ্লোবাল বিজনেস পরিচালনা করছেন।
১. আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (মূল উৎস): Reuters (রয়টার্স) — ট্রাম্পের ক্রিপ্টো ফার্ম 'ওয়ার্ল্ড লিবার্টি', ইরানের নোবিটেক্স এক্সচেঞ্জ এবং ট্রন-বাইনান্সের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্ট (১৮ মে ২০২৬)। ২. ক্রিপ্টো অন-চেইন ডেটা প্ল্যাটফর্ম: Arkham Intelligence — ব্লকচেইন লেজার ট্র্যাকিং, ট্রন ও বিএনবি চেইনে ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংক ও আইআরজিসির ফান্ড ফ্লো অ্যানালিটিক্স। ৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থার রেকর্ড: U.S. Securities and Exchange Commission (SEC) — জাস্টিন সানের মামলার নিষ্পত্তি এবং চ্যাংপেং ঝাওয়ের ফেডারেল ক্ষমার অফিশিয়াল জুডিশিয়াল গ্যাজেট (২০২৫-২০২৬)।
পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের ক্রিপ্টো-বান্ধব নীতি আমেরিকার ডিজিটাল অর্থনীতিতে জোয়ার আনলেও এটি মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিকে এক নজিরবিহীন দ্বিমুখী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে, অন্যদিকে তাঁরই ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক পার্টনারদের চেইন ব্যবহার করে ইরান সরকার কোটি কোটি ডলারের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিচ্ছে। এই ক্রিপ্টো লুপহোল বন্ধ করা না গেলে ট্রাম্পের ইরান নীতি বড় ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়বে।
প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed
পোর্টফোলিও ও যোগাযোগ:
আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ক্রিপ্টো বাজার ও ভূ-রাজনীতির এক্সক্লুসিভ এসইও অপ্টিমাইজড আপডেট পেতে ভিজিট করুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |