| বঙ্গাব্দ

সাবমেরিন ক্যাবলে ইরানের নজর: গুগল-মেটাকে ফি দেওয়ার হুমকি

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 17-05-2026 ইং
  • 13093 বার পঠিত
সাবমেরিন ক্যাবলে ইরানের নজর: গুগল-মেটাকে ফি দেওয়ার হুমকি
ছবির ক্যাপশন: সাবমেরিন ক্যাবলে ইরানের নজর

হরমুজের পর সমুদ্রগর্ভের ইন্টারনেট ক্যাবলে ইরানের নজর: গুগল-মেটাকে ফি দেওয়ার হুমকি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয়

হরমুজ প্রণালিতে সফল সামরিক অবরোধ আরোপের পর এবার বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এবং গোপন একটি লাইফলাইনের দিকে নজর দিয়েছে ইরান। পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন বা সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবল নেটওয়ার্কের ওপর এবার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে তেহরান। এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো মূলত ইউরোপ, এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বিশাল ইন্টারনেট ট্রাফিক ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য আদান-প্রদান করে। ইরান এখন এই নৌপথের নিচে থাকা ইন্টারনেট ক্যাবল ব্যবহারের জন্য গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বড় অঙ্কের ফি বা মাশুল আদায় করার পরিকল্পনা করছে।

নিচে সমুদ্রগর্ভের ইন্টারনেট ক্যাবল নিয়ে ইরানের নতুন কৌশল, আইআরজিসির হুমকি এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল ও আর্থিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো।

প্রযুক্তি জায়ান্টদের লাইসেন্সিং ফি দেওয়ার নির্দেশ ও আইআরজিসির হুমকি

ইরানের আইনপ্রণেতারা ইতোমধ্যে এমন একটি খসড়া পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগকারী সাবমেরিন ক্যাবলগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে তারা ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপর ফি আরোপ করতে যাচ্ছেন।

দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সঙ্গে যুক্ত গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী:

  • লাইসেন্সিং ফি: গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা এবং আমাজনের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের ইরানের নতুন আইন মেনে চলতে হবে এবং ক্যাবল অতিক্রমের জন্য ট্রানজিট ও লাইসেন্সিং ফি দিতে হবে।

  • মেরামতের একচ্ছত্র অধিকার: এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর যেকোনো ধরনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একচ্ছত্র অধিকার কেবল ইরানি কোম্পানিগুলোকেই দিতে হবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো এই ফি দিতে অস্বীকৃতি জানালে পারস্য উপসাগরের ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রযুক্তি জায়ান্টদের পক্ষে ইরানকে কোনো অর্থ প্রদান করা আইনিভাবে অসম্ভব। ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ একে বড় কোনো পদক্ষেপের চেয়ে ইরানের রাজনৈতিক শক্তির মহড়া হিসেবেই দেখছেন।


"ডিজিটাল বিপর্যয়": বৈশ্বিক অর্থনীতি ও যোগাযোগ খাতে গভীর ঝুঁকি

সাবমেরিন ক্যাবল হলো বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগের মূল মেরুদণ্ড। ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি মনে করেন, এটি মূলত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখার এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার জন্য ইরানের একটি সুনির্ধারিত কৌশল।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক অপারেটররা সাধারণত ওমানের জলসীমা দিয়ে ক্যাবল স্থাপন করলেও, ‘ফ্যালকন’ (Falcon) এবং ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’ (GBI) নামের দুটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল নেটওয়ার্ক সরাসরি ইরানের জলসীমার ওপর দিয়েই গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক হাবতূর রিসার্চ সেন্টারের গবেষক মোস্তফা আহমেদ সতর্ক করেছেন যে কম্ব্যাট ডাইভার, ছোট সাবমেরিন এবং আন্ডারওয়াটার ড্রোনে সজ্জিত ইরানি বাহিনী যদি এই ক্যাবলগুলোতে কোনো হামলা বা ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করে, তবে তা কয়েক মহাদেশ জুড়ে একটি ভয়াবহ ‘ডিজিটাল বিপর্যয়’ ডেকে আনবে:

  • আউটসোর্সিং ও আইটি খাতের ক্ষতি: ভারতের মতো বিশাল আউটসোর্সিং ও আইটি শিল্পের শত কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

  • আর্থিক লেনদেন স্থবিরতা: সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ান ডেটা হাব এবং ইউরোপের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আর্থিক লেনদেন মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে যাবে।

  • উপসাগরীয় দেশের সংকট: ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি প্রক্রিয়াও বড় ধরনের জটিলতায় পড়বে।

সুয়েজ খালের উদাহরণ বনাম আন্তর্জাতিক আইন

ইরান অবশ্য এই ফি আদায়ের পরিকল্পনাকে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশনের (UNCLOS) আলোকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে দাবি করছে। তারা মিশরের উদাহরণ টেনে বলছে, মিশর যেভাবে সুয়েজ খালের ওপর ভৌগোলিক আধিপত্য বজায় রেখে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার ট্রানজিট ও লাইসেন্সিং ফি আয় করে, ইরানেরও সেই অধিকার রয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইরিনি পাপানিকোলৌপোলু জানিয়েছেন—সুয়েজ খাল মিশরের খনন করা একটি কৃত্রিম জলপথ হলেও হরমুজ প্রণালি একটি প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক নৌপথ, যার আইনি নিয়ম সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদ্যমান ক্যাবলগুলোর ক্ষেত্রে ইরানকে আগের আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলতে হবে, তবে নতুন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে যেকোনো দেশই তার নিজস্ব জলসীমায় শর্ত আরোপ করার অধিকার রাখে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)

১. আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম (মূল উৎস): সিএনএন (CNN International) — হরমুজ প্রণালি ও সাবমেরিন ইন্টারনেট ক্যাবল নেটওয়ার্কে ইরানের নতুন ফি আরোপের পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন। ২. সামরিক ও রাজনৈতিক বিবৃতি: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (IRGC) এর সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারির অফিসিয়াল এক্স (X) হ্যান্ডেল ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বিবৃতি। ৩. অর্থনৈতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক: ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্স (Bloomberg Economics) — দিনা এসফান্দিয়ারি কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বৈশ্বিক ডিজিটাল ট্রাফিকের অর্থনৈতিক ঝুঁকি সংক্রান্ত বিশ্লেষণ। ৪. আইনি পর্যালোচনা: ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন (UNCLOS) এবং লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটি (SOAS University of London) এর আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের পর্যালোচনা।


শেষ কথা

উপসংহারে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নতুন কৌশল বিশ্বজুড়ে কেবল জ্বালানি সংকট নয়, বরং একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক ডিজিটাল ও আর্থিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে। গুগল-মেটার মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের ফি দেওয়ার এই হুমকি যদি বাস্তবে রূপ নেয় বা কোনো ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা সমগ্র পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency