বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
থাইল্যান্ডে এক দশক আগে আবিষ্কৃত জীবাশ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির এক বিশাল আকৃতির ডাইনোসর শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রকাণ্ড এই তৃণভোজী প্রাণীটির শারীরিক ভর ছিল প্রায় ৯টি পূর্ণবয়স্ক এশীয় হাতির সমান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লোকগাথা, গ্রিক পুরাণ এবং থাইল্যান্ডের উৎপত্তি স্থলের নাম মিলিয়ে এই নতুন প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে—‘নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস’ (Nagatitan chaiyaphumensis)।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন আবিষ্কৃত এই ডাইনোসরটি ছিল লম্বা গলাযুক্ত সরোপড (Sauropod) গোত্রের:
দৈর্ঘ্য ও ওজন: ডাইনোসরটি দৈর্ঘ্যে ছিল প্রায় ২৭ মিটার (৮৮ ফুট) এবং এর ওজন ছিল প্রায় ২৭ টন।
ডিপ্লোডোকাসের চেয়েও ভারী: প্রধান গবেষক থিটিওত সেথাপানিচসাকুল জানান, লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত বিখ্যাত ডিপ্লোডোকাস ডাইনোসরের (ডিপ্পি) চেয়েও এর ওজন অন্তত ১০ টন বেশি ছিল।
বিচরণ কাল: প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি বছর আগে (ক্রিটেশিয়াস যুগে) প্রকাণ্ড এই প্রাণীটি বর্তমান থাইল্যান্ডের ভূখণ্ডে বিচরণ করত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া ডাইনোসরগুলোর মধ্যে এটিই আকারে সবচেয়ে বড়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) পক্ষ থেকে জানানো হয়, থাইল্যান্ডের যে ভূতাত্ত্বিক স্তরে এই ডাইনোসরটির সন্ধান মিলেছে, তা ওই অঞ্চলের সবচেয়ে কম বয়সী শিলাস্তরগুলোর একটি। এই ডাইনোসরটির বিচরণের পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলটি একটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। এই কারণে থাই পিএইচডি শিক্ষার্থী থিটিওত একে ‘দ্য লাস্ট টাইটান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটিই হয়তো বিলুপ্ত হওয়ার আগের সর্বশেষ বা সবচেয়ে সাম্প্রতিককালের বিশাল আকৃতির সরোপড।
এক দশক আগে থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম এই বিশাল প্রাণীর অবশিষ্টাংশ খুঁজে পান। তবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালে এর খননকাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়। উদ্ধার হওয়া জীবাশ্মগুলোর অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণেই একে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংককের ‘থাইনোসর মিউজিয়াম’-এ ডাইনোসরটির একটি বাস্তব আকৃতির (লাইফ-সাইজ) প্রতিকৃতি প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
থাইল্যান্ডে এই প্রকাণ্ড ডাইনোসর আবিষ্কারের ঘটনাটি ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পুরাতত্ত্ব (Paleontology) এবং ভূতাত্ত্বিক গবেষণার বিবর্তনের এক অনন্য মাইলফলক।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও ঔপনিবেশিক পুরাতত্ত্ব (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে এশিয়ার পুরাতাত্ত্বিক গবেষণাগুলো ছিল মূলত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের ওপর নির্ভরশীল। ১৯০০ সালের শুরুতে থাইল্যান্ড (তৎকালীন সিয়াম) স্বাধীন থাকলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণার আধুনিক অবকাঠামো ছিল না। তখন ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কারের বিষয়টি কেবল উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের একচেটিয়া অধিকার মনে করা হতো। ১৯০০ সালের সেই সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে ২০২৬ সালে এসে স্বয়ং থাই গবেষকদের নেতৃত্বে এই আবিষ্কার এশিয়ার বিজ্ঞানীদের সক্ষমতার প্রমাণ।
বিংশ শতাব্দীর শেষে জীবাশ্ম বিজ্ঞান ও এশিয়ার উত্থান (১৯৭০-২০০০): সত্তরের দশকের পর থেকে চীন, মঙ্গোলিয়া এবং থাইল্যান্ডে একের পর এক ডাইনোসরের জীবাশ্ম মিলতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে প্রাগৈতিহাসিক যুগে এশিয়ার ভূখণ্ডটি ডাইনোসরদের অন্যতম প্রধান অভয়ারণ্য ছিল। ১৯০০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এই দীর্ঘ সময়ে টেকটোনিক প্লেটের স্থানান্তর এবং এশিয়ার ভৌগোলিক পরিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে ডাইনোসরদের এই ফসিলগুলো বিজ্ঞানীদের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব পরবর্তী আঞ্চলিক বিজ্ঞান চেতনা ও ২০২৬-এর বাস্তবতা: ২০২৪ সালের পর বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস জানার আগ্রহ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০২৬ সালের এই মে মাসে এসে 'নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস'-এর এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-প্রকৃতি একসময় কতটা সমৃদ্ধ ছিল। গ্রিক পুরাণের 'টাইটান' এবং থাই লোকগাথার জলদেবতা 'নাগ'-এর মিশ্রণে এই নামকরণ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক চমৎকার সমন্বয়।
২০২৬-এর প্রযুক্তি ও থাইনোসর মিউজিয়াম: ১৯০০ সালের দিকে যেখানে ডাইনোসরের হাড় জোড়া লাগানোই ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ, ২০২৬ সালের এই উন্নত থ্রিডি স্ক্যানিং, কার্বন ডেটিং এবং এআই (AI) সিমুলেশনের যুগে এসে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরটির হাঁটাচলা ও শারীরিক ভর নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে পারছেন। ব্যাংককের মিউজিয়ামে এর লাইফ-সাইজ থ্রিডি রেপ্লিকা প্রদর্শন ২০২৬ সালের আধুনিক প্রযুক্তিরই অবদান।
ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর বুক থেকে ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া অবশিষ্টাংশ কোটি কোটি বছর পর মানবসভ্যতাকে পৃথিবীর প্রাচীন জলবায়ু ও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে সাহায্য করছে। ১৯০০ সালের সেই আদিম খনন পদ্ধতি থেকে ২০২৬ সালের এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুরাতত্ত্ব—বিজ্ঞানের অগ্রগতি আজ আমাদের চোখের সামনে কোটি বছর আগের 'সর্বশেষ টাইটান'কে পুনরুজ্জীবিত করেছে। 'নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস' আবিষ্কার কেবল থাইল্যান্ডের জন্য নয়, বরং সমগ্র এশিয়ার প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস পুনর্লিখনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দলিল।
সূত্র: ১. ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL) এবং থাই গবেষক থিটিওত সেথাপানিচসাকুল কর্তৃক ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধ (মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং সরোপড ডাইনোসরদের বিবর্তনের ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |