প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
যুক্তরাজ্যকে বিশ্বের প্রথম ধূমপানমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয়েছে যুগান্তকারী ‘টোব্যাকো অ্যান্ড ভ্যাপস বিল’। এই ঐতিহাসিক আইনের ফলে দেশটিতে একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মের জন্য তামাকজাত পণ্য কেনা আজীবনের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ল। হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডস—উভয় কক্ষে অনুমোদনের পর বিলটি এখন রাজকীয় সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে।
নতুন এই কঠোর আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটছে:
বয়স ভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা: ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারির পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের কাছে তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা আজীবনের জন্য অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমানে যাদের বয়স ১৭ বছর বা তার কম, তারা সারাজীবনে কখনোই বৈধভাবে সিগারেট কিনতে পারবে না।
ভ্যাপিং নিয়ন্ত্রণ: স্কুল প্রাঙ্গণ, খেলার মাঠ, হাসপাতাল এবং শিশু বহনকারী গাড়ির ভেতরে ভ্যাপ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সরকারের বিশেষ ক্ষমতা: ব্রিটিশ মন্ত্রীরা এখন থেকে তামাক ও ভ্যাপিং পণ্যের ফ্লেভার (স্বাদ) এবং মোড়কের নকশা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক আইনি ক্ষমতা পাবেন।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিবেচনায় রেখে বাড়ির ভেতরে, পাব গার্ডেন বা সমুদ্র সৈকতের মতো উন্মুক্ত স্থানে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।
ব্রিটিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এই বিলটিকে দেশের জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই সংস্কার হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচাবে এবং জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার (NHS) ওপর চাপ কমাবে। তবে তামাক শিল্প ও খুচরা বিক্রেতারা এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সাবেক কনজারভেটিভ এমপি লর্ড ন্যাসবি নিষেধাজ্ঞার চেয়ে জনশিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের এই সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদাহরণ। ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসেও তামাকের ব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্যের লড়াইটি এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও ব্রিটিশ আমল (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ উত্তরকালে এ অঞ্চলে তামাক চাষ ও ব্যবহার একটি সাধারণ সামাজিক প্রথা ছিল। ব্রিটিশ শাসকরা তামাক থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় করত, ফলে তখন জনস্বাস্থ্যের চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থই বড় ছিল।
স্বাধীনতা ও সচেতনতা (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন প্রবর্তন করা হয়।
গণতন্ত্র ও ২০২৪-এর বিপ্লব: ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতনের পর থেকে তামাক বিরোধী প্রচারণায় গতি আসে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশ এখন এক নতুন রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সংস্কারমুখী বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ভ্যাপিং ও মাদকের বিস্তার রোধে যুক্তরাজ্যের মতো কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে।
২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন ২০৪০ সালের মধ্যে ‘তামাকমুক্ত দেশ’ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তখন যুক্তরাজ্যের এই নতুন আইন আমাদের জন্য একটি মডেল হতে পারে। ১৯০০ সালের সেই তামাক-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে ২০২৬ সালের সুস্থ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মকে তামাকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে থাকে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ১৯০০ সালের পরাধীন আমলের তামাক উৎপাদন থেকে ২০২৬ সালের যুক্তরাজ্যের এই বৈপ্লবিক নিষেধাজ্ঞা—বিশ্ব আজ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধের গুরুত্ব বেশি বুঝতে পারছে। যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ কেবল জীবনই বাঁচাবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ পৃথিবী উপহার দেবে। ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তামাক কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ শুল্ক আরোপ করে সেই অর্থ জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যবহারের যে প্রস্তাব উঠেছে, তা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যও ভেবে দেখার মতো।
সূত্র: ১. ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘টোব্যাকো অ্যান্ড ভ্যাপস বিল’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন (১০ মে, ২০২৬)। ২. স্বাস্থ্য মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ও অ্যাজমা প্লাস লাং ইউকে-র বিবৃতি। ৩. ঐতিহাসিক দলিল: বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার ইতিহাস (১৯৭১-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |