প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে ‘গুম’ ও ‘আয়নাঘর’ ছিল এক আতঙ্কের নাম। সেই জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) সেলে অমানুষিক নির্যাতন ও গুমের ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এদিন তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।
জবানবন্দিতে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, "আয়নাঘরে সূর্যের আলো পৌঁছাত না। সেখানে আমি দিন গুনতাম খাবার দেখে। সকালের রুটি আসলে বুঝতাম নতুন দিন শুরু হয়েছে। দুপুর ও রাতে ১ পিস মাছ বা মুরগি আর সবজি দিয়ে ভাত দেওয়া হতো। প্রথম দুই মাস একটি পেরেক দিয়ে দেয়ালে দাগ কেটে হিসাব রাখতাম, কিন্তু একদিন সেই দেয়ালের ওপর অন্যদের লেখা দেখে বুঝতে পারি—এখান থেকে মুক্তি অনিশ্চিত। এরপর আমি হিসাব রাখা বন্ধ করে দিই।"
হুম্মাম কাদের তার জবানবন্দিতে ২০১৬ সালের সেই দিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, "সকাল ৯টায় ধানমন্ডির বাসা থেকে সিএমএম কোর্টে যাওয়ার পথে বংশাল থানার সামনে সিভিল পোশাকধারী ৭-৮ জন ব্যক্তি আমার গাড়ি ঘেরাও করে। আমি বুঝতে পারি বিপদ আসন্ন, তাই মোবাইল ও ওয়ালেট মার কাছে দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যাই। সেখান থেকে আমাকে প্রথমে ডিবি কার্যালয় এবং রাত ১১টার পর চোখ বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে করে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।"
তিনি আরও জানান, ফ্লাইওভার ও রাস্তার মোড় ঘোরার ধরন দেখে তিনি বুঝেছিলেন তাকে বিমানবন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে ‘যমটুপি’ পরিয়ে তাকে হস্তান্তর করা হয় অন্য একটি গ্রুপের কাছে, যারা তাকে দীর্ঘ ৭ মাস আয়নাঘরে বন্দি করে রাখে।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন নতুন নয়, তবে ‘গুম’ সংস্কৃতি এক কালো অধ্যায় যোগ করেছে।
১৯০০-১৯৪৭ (ব্রিটিশ আমল): সে সময় রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন চললেও ‘নিখোঁজ’ হওয়া বা ‘আয়নাঘর’ সদৃশ বন্দিশালার উদাহরণ বিরল ছিল।
১৯৫২-১৯৭১ (পাকিস্তান আমল): সামরিক জান্তা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার চালালেও ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ৭১-এর যুদ্ধের পর মানুষ আশা করেছিল একটি স্বাধীন ও নিরাপদ ভূখণ্ডের।
২০০৯-২০২৪ (শেখ হাসিনা আমল): এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে ‘গুম’ সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। হুম্মাম কাদের চৌধুরীর মতো অসংখ্য মানুষ বিনা বিচারে বছরের পর বছর বন্দি ছিলেন।
২০২৪-২০২৬ (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিচার): ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে এই প্রথম রাষ্ট্রীয় আয়োজনে হওয়া গুমের বিচার শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি এই সাক্ষ্যগ্রহণ বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ মামলায় পলাতক প্রধান আসামি শেখ হাসিনা ছাড়াও সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী এবং ডিজিএফআই-এর সাবেক ৫ জন মহাপরিচালকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। বর্তমানে ৩ জন আসামি—মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী কারাগারে রয়েছেন।
হুম্মাম কাদের চৌধুরীর এই সাক্ষ্য কেবল একটি মামলার জবানবন্দি নয়, বরং এটি দীর্ঘ এক দশকের শাসনতান্ত্রিক নিপীড়নের দালিলিক প্রমাণ। ১৯০০ সালের সেই স্বাধীনচেতা আন্দোলন থেকে ২০২৪-এর বিপ্লব—বাঙালি জাতি বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালে এসে এই বিচার প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সময়ের আবর্তে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হয়।
সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রসিডিংস, যুগান্তর অনলাইন, বিএসএস (BSS) এবং ভুক্তভোগীর জবানবন্দি।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |