নির্বাচন-পরবর্তী সরকার কাঠামো: বিএনপি-জামায়াতের ভিন্ন মত ও ২০২৬-এর নতুন সমীকরণ
প্রতিবেদকের নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে নির্বাচনের আগেই উত্তাপ ছড়িয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে। জামায়াতে ইসলামী যেখানে 'জাতীয় সরকার'-এর রূপরেখা দিচ্ছে, সেখানে বিএনপি অনড় রয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের 'জাতীয় ঐকমত্যের সরকার'-এর প্রস্তাবে। এই দুই মেরুর ভিন্ন চিন্তাভাবনা কি কোনো বড় ফাটলের ইঙ্গিত, নাকি কৌশলগত অবস্থান—তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে চলছে তীব্র বিশ্লেষণ।
সম্প্রতি ১ জানুয়ারি (২০২৬) বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে গুলশান কার্যালয়ে যান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠকটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে এই সাক্ষাৎ, তবে বৈঠক শেষে জামায়াতের আমিরের বক্তব্য ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত 'ইঙ্গিতপূর্ণ'। তিনি বলেন, "৫ বছরের জন্য জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমরা সবাই মিলেমিশে ভালো কোনো চিন্তা করতে পারি কি না, সেটা আমাদের ভাবা দরকার। নির্বাচনের পরপরই সরকার গঠনের আগে আমরা ইনশাআল্লাহ বসব।"
বিএনপি ও জামায়াতের প্রস্তাবের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা:
জামায়াতের প্রস্তাব (জাতীয় সরকার): জামায়াত বর্তমানে ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) ও এবি পার্টিসহ ১০টি দলের একটি শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সব দলের অংশগ্রহণে একটি 'জাতীয় সরকার' প্রয়োজন। তারা দুর্নীতি দমন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো ৩টি শর্তও জুড়ে দিয়েছে।
বিএনপির অবস্থান (জাতীয় ঐকমত্যের সরকার): বিএনপি ২০২২ সাল থেকেই তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে 'জাতীয় ঐকমত্যের সরকার' গঠনের কথা বলে আসছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, তাদের প্রস্তাবটি ছিল যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে। বিএনপি মনে করে, সব দল সরকারে থাকলে সংসদে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল থাকবে না, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বাঙালির রাজনৈতিক বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপির জন্ম এবং পরবর্তীতে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে ২০০১-২০০৬ সালের জোট সরকারের পর এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এই দুই মিত্রের মধ্যে দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
২০২৫ সাল জুড়ে চলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের পর ২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে 'দ্বিতীয় স্বাধীনতার' পর প্রথম অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের যে চেতনা, ২০২৬ সালের এই লড়াইয়ে সেই চেতনার ধারক হিসেবে বিএনপি ও জামায়াত এখন একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বর্তমানে ভোটের মাঠ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে বিএনপি ও তাদের সমমনা যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সাথে থাকা এনসিপি ও সমমনা দলসমূহ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচন কার্যত এই দুই বৃহৎ শক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, "নির্বাচন-পরবর্তী সরকার কেমন হবে, তা নির্ভর করবে ভোটের ফলাফল ও সেই সময়ের বাস্তবতার ওপর।" তবে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া নাকি দেশ পরিচালনায় সহযোগিতা—এই দুই সমীকরণের ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্য।
সূত্র: ১. যুগান্তর অনলাইন ও সমকালীন রাজনৈতিক বিশেষ কলাম (জানুয়ারি ২০২৬)। ২. বাংলাদেশ প্রতিদিন পলিটিক্যাল ডেস্ক ও নির্বাচন কমিশন ডাটাবেজ। ৩. বিবিসি বাংলা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষ পর্যালোচনা।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |