গুম কমিশনের চূড়ান্ত রিপোর্ট: সাড়ে ১৫ বছরে ৬ হাজার গুম, নেপথ্যে সরাসরি শেখ হাসিনার নির্দেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের নাম ছিল 'গুম'। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সময়ে দেশে প্রায় ৬ হাজার ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯ জনকে ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে গুম সংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’। এই নৃশংসতার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গতকাল রবিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব তথ্য—যেখানে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের মতো হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের গুম করার পেছনে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি জড়িত ছিলেন। অনেককে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:
জামায়াত-শিবির: জীবিত ফিরে আসাদের ৭৫ শতাংশই এই দলের নেতাকর্মী। মোট রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে ৪৭৬ জন জামায়াত এবং ২৩৬ জন ছাত্রশিবিরের।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন: এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের ৬৮ শতাংশই বিএনপির নেতাকর্মী। গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪২ জন বিএনপি, ৪৬ জন ছাত্রদল এবং ১৭ জন যুবদলের। কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে। এটি মূলত একটি 'পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম'।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। বরিশালের বলেশ্বর নদীকে বানানো হয়েছিল গুম হওয়া ব্যক্তিদের শেষ ঠিকানা। শত শত মানুষকে হত্যার পর এই নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ গুমের অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। তদন্তকালে ২৮৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক নিপীড়নের ধারা দীর্ঘদিনের। ১৯০০ সালের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শুরু করে ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন—সবই ছিল বাঙালির কণ্ঠরোধের চেষ্টা। তবে ২০০৯-২০২৪ সালের এই গুমের সংস্কৃতি ইতিহাসের সব বর্বরতাকে হার মানিয়েছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গুম ও হত্যা করে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে ফেলে রেখেছিল, ২০২৪ সালের পূর্ববর্তী শাসনামলে 'আয়নাঘর' বা বলেশ্বর নদীর হত্যাকাণ্ড সেই বীভৎস স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ১৯০০ সাল থেকে চলে আসা স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামোর মূলে আঘাত করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এই রিপোর্টকে 'পৈশাচিকতার ডকুমেন্টেশন' হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে।
প্রতিবেদন গ্রহণকালে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে—এটা তারই প্রমাণ। যারা এই ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা আমাদের মতোই মানুষ হয়ে সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। এই নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।” তিনি আয়নাঘরসহ সব গুমের স্থান ম্যাপিং করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: ১. গুম সংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদন (জানুয়ারি ২০২৬)। ২. প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় (যমুনা) থেকে দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তি। ৩. মানবাধিকার সংস্থা অধিকার ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের বিগত ১৫ বছরের আর্কাইভ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |