প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ভোরের আলো ফোটার আগেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে নেমে আসে শোকের ছায়া। রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুতে অবসান হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায়ের।
হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তৃণমূল কর্মী টিপু সুলতানের সেই আকুতি— ‘আমি আমার কিডনি দিতে চাই’—আজ কোটি সমর্থকের হৃদয়ের আর্তনাদ হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। টিপু সুলতানের মতো হাজারো কর্মীর কাছে তিনি ছিলেন কেবল একজন নেত্রী নন, বরং গণতন্ত্রের এক ‘মা’ সমতুল্য অভিভাবক।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশকের সেই উত্তাল সময় থেকে ২০২৫ সালের সংস্কারমুখী বাংলাদেশ পর্যন্ত তার ছায়া বিদ্যমান।
জন্ম ও শৈশব: ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার শিকড় ছিল ফেনীর মাটিতে। দেশভাগের ঠিক পূর্বমুহূর্তে তার পরিবার পূর্ববঙ্গে থিতু হয়। ১৯৫০-এর দশকে যখন ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকারের লড়াই শুরু হয়, তখন তিনি কেবল বেড়ে উঠছিলেন।
রাজনীতিতে অভিষেক: ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর দেশ যখন গভীর সংকটে, তখনই রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে এই গৃহবধূর। ১৯৮২ সালে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৮৪ সালে দলের হাল ধরেন।
স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম (১৯৮২-১৯৯০): জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে লড়াই করেছেন তিনি। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে আপসহীন ভূমিকার জন্য তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পান।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। তার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে:
মেয়েদের শিক্ষা: নারী শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি।
জিডিপি ও অর্থনীতি: ২০০৬ সালে তার মেয়াদের শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৭%, যাকে বিশ্বব্যাংক ‘এশিয়ার রাইজিং টাইগার’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।
২০০৮ সালের পর থেকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন বলে দাবি করেন তার সমর্থকরা। ২০১৮ সালে দুর্নীতির কথিত মামলায় কারাবরণ এবং পরবর্তীতে নিজ বাসভবনে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের প্রবাস জীবন তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও তিনি কখনো মাথা নত করেননি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া কারামুক্ত হন। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান জানান। তার সেই সংযত ভাষা এবং ধৈর্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের আগেই তার প্রস্থান দেশবাসীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর মতে, "তার পুরো জীবন ছিল কষ্টে ভরা। তবু তিনি নিজের আরামের চেয়ে দেশকে বেছে নিয়েছেন। এই কারণেই তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়েও তার সময়ের অন্যতম প্রতীকী নেতা হিসেবে স্মরণীয়।"
ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, "তিনি নিজের অবস্থান থেকে খুব কমই সরে এসেছেন। চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও তিনি সংযত ভাষা ব্যবহার করে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিচয় দিয়েছেন।"
১৯৫০ সাল থেকে ২০২৫ সালের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতায় থাকা নয়, বরং জনগণের অধিকারের জন্য অবিচল থাকা। তার শূন্যতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরাট গহ্বর তৈরি করল, যা পূরণ হওয়া সহজ নয়।
সূত্রসমূহ: ১. আল জাজিরা (সাক্ষাৎকার ও প্রতিবেদন)। ২. যুগান্তর আর্কাইভ ও বিএনপি কেন্দ্রীয় প্রেস রিলিজ। ৩. বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন: ১৯৫০-২০২৫ (গুগল নিউজ ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |