রাজনীতির নতুন সমীকরণ: খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দী; মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক, সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
প্রতিবেদকের নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটি এবারই প্রথম একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে তাদের দলীয় প্রতীক নিয়ে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। খুলনা জেলার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনে এই ঐতিহাসিক মনোনয়ন পেয়েছেন কৃষ্ণ নন্দী। তিনি বর্তমানে ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে এই মনোনয়ন ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কারণ কৃষ্ণ নন্দী একদিকে যেমন জামায়াতের প্রার্থী, অন্যদিকে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের অতি ঘনিষ্ঠজন। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে এই মনোনয়ন নিয়ে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত এবং বিস্মিত।
পেশায় ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দীর গ্রামের বাড়ি ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে। চুকনগর দিব্যপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে তিনি মোটরসাইকেল শোরুম, তেল, রড-সিমেন্ট ও টিনের ব্যবসা শুরু করেন। পারিবারিকভাবে তার বাবা একসময় মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরের অনুসারী ছিলেন বলে জানা যায়।
কৃষ্ণ নন্দীর দাবি, ২০০৩ সালে খুলনা-১ আসনের সাবেক জামায়াতের এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের হাত ধরে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি নিজেকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুবান্ধব মনোভাবের কারণে এ দলের প্রতি আস্থাশীল বলে দাবি করেন।
কৃষ্ণ নন্দীর মনোনয়ন স্থানীয় জামায়াত নেতা শেখ আবু ইউসুফকে হটিয়ে কীভাবে এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কৃষ্ণ নন্দী ছিলেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ঘনিষ্ঠজন। মন্ত্রীর সঙ্গে তার বিভিন্ন কর্মসূচির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে।
চুকনগর এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ক্ষুব্ধ জনতা কৃষ্ণ নন্দীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ মনে করে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে আগুন দেয়। তাদের অভিযোগ, নিজেকে বাঁচাতে তিনি এখন জামায়াতের ব্যানারে এসেছেন।
কৃষ্ণ নন্দী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "ব্যবসায়ী হিসেবে মন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ঘনিষ্ঠতার কথা অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।" তিনি জানান, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ মন্ত্রী হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তাকে ফুল দেওয়া ছবি নিয়ে এখন কাদা–ছোড়াছুড়ি হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানে কৃষ্ণ নন্দীর উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো পুরনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্বস্ত সূত্র মারফত নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিশেষ একটি সংস্থার সঙ্গে কৃষ্ণ নন্দীর নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।
জানা যায়, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ওয়ার্ল্ড হিন্দু স্ট্রাগলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিপন কুমার বসুর সঙ্গে কৃষ্ণ নন্দীর অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রমাণ হিসেবে শিপন ও কৃষ্ণ নন্দীর কিছু ছবিও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়— একই বৈঠকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এই অভিযোগ তার রাজনৈতিক যাত্রাপথের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে (১৯৫০-২০২৫) ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানের মূলনীতি হলেও, সংখ্যালঘুরা প্রায়শই রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত।
জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দল, যারা ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করেছে, সেই দলের পক্ষ থেকে একজন হিন্দুকে (কৃষ্ণ নন্দী) মনোনয়ন দেওয়া দলটির ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্ত জামায়াতকে উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে দেখানোর একটি চেষ্টা হতে পারে, তবে তার ব্যক্তিগত বিতর্কিত সম্পর্ক ও স্থানীয় অসন্তোষ এই মনোনয়নকে জটিল করেছে।
সূত্র ও বিশ্লেষণ
সূত্র: ১. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন বোর্ড ও স্থানীয় কমিটি সূত্র। ২. খুলনা-১ আসনের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাধারণ জনগণের বক্তব্য। ৩. চুকনগর এলাকার একাধিক ব্যবসায়ীর মন্তব্য। ৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও তথ্য।
বিশ্লেষণ প্রতিবেদন কারির নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
বিশ্লেষণ: খুলনা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে (১৯৫০-২০২৫) একটি নতুন ও অপ্রত্যাশিত দিক। একদিকে, এটি জামায়াতের অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, অন্যদিকে, প্রার্থীকে নিয়ে ওঠা বিতর্ক (সাবেক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ) এই মনোনয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই মনোনয়ন জামায়াতের দীর্ঘদিনের কঠোর ভাবমূর্তি ভাঙার চেষ্টা হলেও, স্থানীয় অসন্তোষ এবং গোপন সংস্থার যোগসূত্রের অভিযোগ এই প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |