বিএনপি–জামায়াতের বাইরে নতুন জোট আসছে: ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা এনসিপির
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি–জামায়াতের বাইরে “ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী ও চাঁদাবাজবিরোধী” একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–র মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি দাবি করেছেন, এই জোট আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিতে চায় এবং লক্ষ্য থাকবে “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন”।
সোমবার (২৫ নভেম্বর) রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে দুই দিনব্যাপী মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে দলের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, জাতীয় পার্টিকে ব্যবহার করে ভারত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচন বানচাল ও দেশ অস্থিতিশীল করার “চেষ্টা করছে”।
নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, শিগগিরই একটি নতুন অ্যালায়েন্স দেখতে পাবে দেশবাসী—
এই জোটের বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—
ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান,
চাঁদাবাজ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান,
নারীর পক্ষে ও আলেম–ওলামার পক্ষে একসঙ্গে কাজের প্রতিশ্রুতি,
“জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন”–কে রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিণত করা।
তার ভাষায়, দেশে রাজনীতির মূল মেরু আর শুধু পুরোনো দুই জোটে সীমাবদ্ধ থাকবে না; “কয়েক দিনের মধ্যে বিএনপি–জামায়াতের বাইরে গিয়ে নতুন আরেকটি জোট দেখবে দেশের মানুষ”, যারা “জনতার ক্ষমতা, সংস্কার, নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার”–এর পক্ষে অবস্থান নেবে বলে দাবি করেন তিনি।
ডেইলি স্টার–এ প্রকাশিত আরেক বক্তব্যে তিনি নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান কমিশন “একপাক্ষিকভাবে” কাজ করছে এবং তাদের “ফেয়ার প্লেয়িং ফিল্ড” দেওয়া হচ্ছে না।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে যে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান, পরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ বা ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত, সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকেই উঠে আসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ওই গণঅভ্যুত্থানের জেরে ৫ আগস্ট দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ ও দেশত্যাগে বাধ্য হন এবং ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।
জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্র সংগঠন ‘স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন’ (Students Against Discrimination) এবং ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’–র উদ্যোগে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বড় আকারের ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিতি পায়। দলটির প্রতিষ্ঠা–ঘোষণায় “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” গঠনের কথা বলা হয়—অর্থাৎ বর্তমান সংবিধানের “সংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র” ভেঙে নতুন গণপরিষদের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা–নির্ভর রাষ্ট্র বিনির্মাণের দাবি তোলে তারা।
উইকিপিডিয়া ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন জুলাই আন্দোলনের মুখ্য ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম, আর মাঠের সংগঠনে বিভিন্ন অঞ্চলে আছেন কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক সমন্বয়করা; তাদের মধ্যে নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় তৈরি হয় ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’—রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের একটি খসড়া ব্লুপ্রিন্ট। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি দল এই চার্টারে স্বাক্ষর করলেও এনসিপি, সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি দল তা বয়কট করে। তাদের অভিযোগ, চার্টারে উল্লেখ করা সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য “আইনগত বাধ্যতামূলক কাঠামো” নেই।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি–ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ ব্যানারে ঢাকায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণের দাবিতে আন্দোলনে শীর্ষ ভূমিকা নেয় এনসিপি–র নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। তাদের টানা অবরোধ ও বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ১০–১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ও দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে—এমনটি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ও বিভিন্ন গণমাধ্যম।
এ নিয়ে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কিছু প্ল্যাটফর্ম অভিযোগ তুলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার “এনসিপি ও ধর্মীয় কট্টর গোষ্ঠীর চাপে” এই নিষেধাজ্ঞার পথে হেঁটেছে; অন্যদিকে এনসিপি নেতৃত্ব একে “ফ্যাসিস্ট রাজনীতির বিচারের পথে প্রথম ধাপ” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, জাতীয় পার্টিকে (জাপা) সামনে রেখে ভারত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচন বানচাল ও দেশকে অস্থিতিশীল করার “স্ক্রিপ্ট” লিখছে। তার অভিযোগ—
“ভারত এবং আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক যে শক্তিগুলো ছিল, তারা জাতীয় পার্টির মাধ্যমেই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত ও দেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে হাসনাত একদিকে ভারতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব, অন্যদিকে জাতীয় পার্টির “কিংমেকার” ভূমিকাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান। যদিও এ বিষয়ে জাতীয় পার্টি বা ভারতের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি কখনো ক্ষমতাসীন দলের ‘সহযোগী’, কখনো বিরোধী, আবার কখনো দুই ধারার মাঝামাঝি অবস্থানে থেকেছে—এমন বিশ্লেষণ বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আছে। আসন্ন নির্বাচনেও তারা কার সঙ্গে থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, শেখ হাসিনার পতন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও পরে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘দ্বিদলীয়’ রাজনীতিতে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। একদিকে পুরোনো দুই প্রধান দল—বিএনপি ও কাঠামোগতভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বাইরে গিয়ে নতুন সেতু তৈরির চেষ্টা করছে; অন্যদিকে ছাত্র–নাগরিক নেতৃত্ব থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপি নিজেকে “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র–মুখী বিকল্প শক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই চার্টার, গণভোট ও নির্বাচন–সংক্রান্ত যে সময়সূচি ও রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, তা ঘিরেও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতভেদ আছে। একদিকে ড. ইউনূস সরকারের মতে, নতুন কাঠামো তৈরির পথে এটি “নতুন বাংলাদেশের জন্ম”; অন্যদিকে এনসিপি ও কিছু বাম দল অভিযোগ করছে, চার্টারে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও বাধ্যতামূলক আইনগত অঙ্গীকার পরিষ্কার নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে এনসিপি নেতৃত্বের ঘোষিত নতুন জোট—
বিএনপি–জামায়াতের বাইরে নিজস্ব মেরু গড়তে চাওয়া,
ধর্মীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে রাজনৈতিক প্যাকেজ হিসেবে তুলে ধরা,
নারী, আলেম–ওলামা ও নাগরিক অধিকারের ভাষা একসঙ্গে ব্যবহার করে ‘বিগ–টেন্ট’ রাজনীতির আকার দেওয়ার চেষ্টা—
এই তিনটি দিক থেকেই আগামীর নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে জোটের অন্য দলের নাম, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, আসন–সমঝোতা ও নীতিগত অবস্থান কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।
১. দৈনিক যুগান্তর অনলাইন সংস্করণ – “নতুন জোটের ঘোষণা এনসিপির” প্রতিবেদন; নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য ও এনসিপির সংবাদ সম্মেলনের বিবরণ।
২. দ্য ডেইলি স্টার – “New alliance to be unveiled: Patwary”; আসন্ন নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী, সংস্কার, নারী ও গণতন্ত্রের পক্ষে জোট–সংক্রান্ত মন্তব্য এবং নির্বাচন কমিশন–বিষয়ক সমালোচনা।
৩. উইকিপিডিয়া, রয়টার্স, এএফপি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম – জাতীয় নাগরিক পার্টির গঠন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (২০২৪), ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার, জুলাই ন্যাশনাল চার্টার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলন এবং এনসিপির রাজনৈতিক ভূমিকা–সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক তথ্য।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |