প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলার রাজনীতির আঙিনায় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং ২০২৬-এর আসন্ন নির্বাচন—প্রতিটি মোড়ই একেকটি নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। ১৯০০ সালের সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আজকের ২০২৬ সালের মধ্য-জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষমতা কাঠামোর রূপান্তর ছিল রক্তক্ষয়ী ও অভাবনীয়। বর্তমানে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজপথ যখন নতুন মেরুকরণে উত্তপ্ত, তখন রাজনীতির মাঠ থেকে প্রায় 'অদৃশ্য' হয়ে গেছে টানা ১৫ বছর শাসন করা আওয়ামী লীগ।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে যে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, তা ১৯৪৭-এর দেশভাগ হয়ে ১৯৭১-এর স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পালাবদল আমরা দেখেছি। তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলকে বিশ্লেষকরা 'কর্তৃত্ববাদী শাসনের' এক দীর্ঘ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই শাসনের অবসান ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।
সম্প্রতি আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাজবাড়ী জেলার পদ্মা পাড়ের জেলে রিপন মৃধার মতো হাজারো আওয়ামী সমর্থকের মনের কথা। ১৫ বছরের শাসনামলে রাজপথের দেয়ালে ও শাটারে যেসব নেতার পোস্টার শোভা পেত, আজ সেখানে কেবল শূন্যতা। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার পর রাজবাড়ী থেকে গোপালগঞ্জ—সবখানেই দলটির সমর্থকরা বিভক্ত। গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলায়মান মিয়ার সাফ কথা, "ব্যালটে নৌকা ছাড়া নির্বাচন কোনো নির্বাচন না।" ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ না থাকা দলটির ভোটব্যাংকে এক বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠ এখন বিএনপির দখলে। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ডিসেম্বরে তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চমকে দিয়েছেন তার কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। দলীয় কোনো পদে না থাকলেও দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি সরব। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী 'জেন-জি' বা তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতেই জাইমা রহমানকে সামনে আনা হচ্ছে। তাকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত এক আধুনিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করছে বিএনপি, যা জামায়াতের মতো রক্ষণশীল শক্তির বিপরীতে দলটিকে একটি লিবারেল ইমেজ দিচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ২০২৬ সালের রাজনীতির এক বিস্ময়কর ঘটনা। নিষিদ্ধ হওয়ার গ্লানি মুছে দলটি এখন ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জোটের প্রধান ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান কুমিল্লার সমাবেশে ঘোষণা করেছেন, তারা বিজয়ী হলে পরাজিতদের নিয়েও 'ঐক্যের সরকার' গঠন করবেন। ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া এ দেশের রাজনীতিতে 'পরাজিতদের নিয়ে সরকার' গঠনের এমন প্রস্তাব রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঢাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি এবং অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, আওয়ামী লীগকে ছাড়া নির্বাচন হয়ে গেলে দলটির ভোটাররা ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায় অন্য শক্তিগুলোর সাথে মিশে যাবে। তবে মার্কিন থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার পারিবারিক রাজনৈতিক দলগুলো সহজে বিলুপ্ত হয় না। শেখ হাসিনা হয়তো ভারতে বসেই তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে উত্তরসূরি হিসেবে সামনে এনে 'অপেক্ষা করার কৌশল' নিতে পারেন।
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করায় দলটির ফেরা এখন পাহাড়সম বাধার সম্মুখীন। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ভোট শুধু নতুন সরকার গঠন নয়, বরং এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আদৌ কোনো জায়গা ভবিষ্যতে থাকবে কি না।
সূত্র: আল-জাজিরা বিশেষ প্রতিবেদন, ডা. শফিকুর রহমানের জনসভার বক্তব্য, ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের অনুষ্ঠানিক বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায় এবং জাতীয় সংবাদপত্রের আর্কাইভ।
বিশ্লেষণ: ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশের মানুষ স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে গণতন্ত্রকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ১৯৯০-এ এরশাদ বা ২০২৪-এ হাসিনার পতন সেই সত্যই প্রমাণ করে। তবে ২০২৬-এর নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। নতুন বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |