বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে তরুণ সমাজ সামনে থেকেছে—কখনো ভাষার জন্য, কখনো গণতন্ত্রের জন্য, আবার কখনো কোটা সংস্কারের দাবিতে। এই ঐতিহাসিক ভূমিকার ধারাবাহিকতাতেই শনিবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ফোর্থ ন্যাশনাল ডিবেট কম্পিটিশন ২০২৫’-এ যুগান্তর সম্পাদক ও কবি আবদুল হাই শিকদার বলেছেন, “১৬ বছরের নষ্ট রাজনীতি থেকে দেশকে উদ্ধার করেছে এ দেশের তরুণ সমাজ।”
তিনি বলেন, জুলাই মাসে তরুণরা কোনো স্বার্থ ছাড়াই দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুগ্ধর কথা টেনে তিনি বলেন, “চারদিকে গুলির মধ্যে দাঁড়িয়ে সহযোদ্ধাদের জন্য পানি সরবরাহ করছিল সে। ঘাতকের গুলি তার জীবন কেড়ে নেয়।” একইভাবে আবু সাঈদ নামের এক তরুণের আত্মত্যাগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন—“তার রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই ফ্যাসিবাদ বিলুপ্ত হয়েছে।”
আবদুল হাই শিকদার এই প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেন, যখন তরুণদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি তরুণদের হাজার সালাম জানাই। তরুণরাই দেশকে অন্ধকার থেকে বের করে এনেছে।”
অনুষ্ঠানে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগকে সমালোচনা করে বলেন, “ড. ইউনূস এমন একজন মানুষ যাকে বিশ্বের সব ভাষার মানুষ এক নামেই চেনে। তবে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে অন্তর্বর্তী সরকার নয়, বিপ্লবী সরকার প্রয়োজন ছিল।”
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে বলেন, “দেশের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নষ্ট মানুষগুলো বের হতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সতর্ক না হয় তবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বিলুপ্ত হবে।”
একইসাথে তিনি শেখ মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদ দর্শনের সমালোচনা করেন এবং বলেন, “স্বাধীনতার যুদ্ধে চাকমা, গারো, সাঁওতাল, মারমা, বিহারিসহ সব সম্প্রদায় অংশ নিয়েছিল। তাহলে সেটি কেবল বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিভাবে হয়? এই ভুল দর্শন থেকে বের করতেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণা দেন।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম তরুণদের আত্মত্যাগের স্মরণে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদা গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের প্রশিক্ষণস্থল।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুনুর রশিদ খান বলেন, বিতর্ক তরুণদের যুক্তিবাদী চেতনা গড়ে তোলে।
টিআইবির ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর জাফর সাদিক বিচারক হিসেবে তরুণ প্রজন্মের নৈতিক সাহসের প্রশংসা করেন।
বিতর্ক ক্লাব নৈয়ায়িক-এর সভাপতি হিজবুল্লাহ তামিম প্রতিযোগিতার সভাপতিত্ব করেন।
প্রতিযোগিতায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিজয়ী হয়, রানার-আপ হয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)। বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি টার্নিং পয়েন্টে তরুণদের ভূমিকা নির্ধারক—
১৯৫২ ভাষা আন্দোলন: সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের রক্তে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়।
১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান: ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ আইয়ুব সরকারের পতন ঘটায়।
১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ: মুক্তিবাহিনীর বেশিরভাগই তরুণ; ১৬ ডিসেম্বর বিজয় আসে।
১৯৯০ গণঅভ্যুত্থান: ছাত্রদের নেতৃত্বে স্বৈরাচার এরশাদের পতন।
২০০৭–২০০৮ জরুরি অবস্থা: ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হলেও তরুণদের দাবি সেসময়েও স্পষ্ট ছিল।
২০১৮ ও ২০২৪ নির্বাচন: বিতর্কিত প্রেক্ষাপটে তরুণদের অংশগ্রহণ প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলন: জুলাই মাসে আবু সাঈদ ও মুগ্ধর মতো তরুণরা জীবন দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪–২০২৫: ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হলেও তরুণরাই রাজনীতির মাঠে পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে আছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়—যে কোনো প্রেক্ষাপটেই তরুণরাই পরিবর্তনের মূল চালক। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার—সবক্ষেত্রেই তাদের রক্ত ও আত্মত্যাগ গণতন্ত্র ও ন্যায়ের পথ সুগম করেছে।
আজকের বক্তব্যে আবদুল হাই শিকদারের কথায় সেই ঐতিহাসিক সত্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তরুণদের এই চেতনা যদি রাজনৈতিক দলগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে বাংলাদেশ আবারও নতুন গণতান্ত্রিক দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।
যুগান্তর (বক্তৃতার অংশবিশেষ)
বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভস
Banglapedia (Language Movement, Liberation War)
Reuters, BBC, Al Jazeera (2018–2025 রাজনৈতিক প্রতিবেদন)
The Daily Star, The Business Standard (৭ মার্চ ভাষণ, কোটা রায় কভারেজ)
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |