| বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যে ২০% পাল্টা শুল্ক, চাপে রপ্তানি খাত

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 01-08-2025 ইং
  • 4435275 বার পঠিত
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যে ২০% পাল্টা শুল্ক, চাপে রপ্তানি খাত
ছবির ক্যাপশন: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যে ২০% পাল্টা শুল্ক, চাপে রপ্তানি খাত

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক: বাংলাদেশের বাণিজ্যে নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা?

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
১ আগস্ট ২০২৫ | সূত্র: হোয়াইট হাউস, বিজিএমইএ, বাংলাদেশ দূতাবাস

বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্র এবার কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। ৩১ জুলাই ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষিত এক নতুন নির্দেশনায় বাংলাদেশের সব রপ্তানি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৭০টির বেশি দেশের ওপরও নতুন বা বাড়তি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি এবং ইউএস-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

‘ফেয়ার ট্রেড’ নাকি ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’? পেছনের কাহিনি

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যামতে, অনেক দেশ দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকান বাজারে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্ক সুবিধা পেলেও তারা পাল্টা মার্কেট প্রবেশাধিকার দেয়নি। ফলে ‘ফেয়ার ট্রেড’ নিশ্চিত করতে তারা এখন এই বৈষম্যমূলক নীতিমালা সংশোধনে নেমেছে।

এমন উদ্যোগ ১৯৭১ সালের পর আর দেখা যায়নি, যখন প্রেসিডেন্ট নিক্সন একতরফাভাবে ডলারের সোনার মান থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে বৈশ্বিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থায় ভূমিকম্প ঘটান। সেই সময়ও অনেক উন্নয়নশীল দেশ এই ধরনের আর্থিক কৌশলের শিকার হয়েছিল। ২০২৫ সালে এসে একই ধরনের বৈশ্বিক শুল্ক পুনর্বিন্যাস আবার আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশের শুল্ক হার বাড়লেও তুলনামূলক ভালো?

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, “আমাদের ওপর শুল্কের হার ভারতের চেয়ে কম হওয়াটা কিছুটা স্বস্তির। তবে সামগ্রিকভাবে মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে, ফলে বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ এখনো জিএসপি সুবিধা ফিরে পায়নি। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর থেকে সেই সুবিধা স্থগিত রয়েছে। নতুন এই ২০ শতাংশ শুল্ক সেই জিএসপি ফেরত পাওয়ার আশাকেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।

ইতিহাসের পেছনে ফিরে দেখা: বাণিজ্যে ‘বৈষম্য’ ও বাংলাদেশের অবস্থান

১৯৮০-এর দশকে এরশাদ সরকারের সময় বাংলাদেশ প্রথম বড় পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে উদ্যোগ নেয়। সেই সময় কৃষিপণ্য, চা এবং হস্তশিল্প রপ্তানিতে অগ্রগতি দেখা গেলেও তৈরি পোশাক খাত ১৯৯০–২০০০ সময়কালে পূর্ণতা পায়।

২০০১ সালের পর ওয়াশিংটন-বাংলাদেশ সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো শীতল ছিল। বিশেষ করে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের জেরে ব্যবসায়িক সম্পর্কেও প্রভাব পড়ে।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন “Build Back Better World” উদ্যোগ ঘোষণা করলে, দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ—including Bangladesh—সেই প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে ২০২৫ সালে এসে এই শুল্ক নীতিমালা সেই কৌশলগত অংশীদারিত্বেও প্রশ্ন তুলছে।

দুই পক্ষের টানা ১৬ ঘণ্টার আলোচনা: কী আলোচনা হলো?

বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিনের নেতৃত্বে এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে ওয়াশিংটনে রয়েছে।

  • প্রথম দিন: ৬ ঘণ্টা বৈঠক

  • দ্বিতীয় দিন: ৮ ঘণ্টা আলোচনায় রপ্তানি ও শুল্ক ইস্যু

  • তৃতীয় দিন: ২ ঘণ্টা আলোচনা শেষে প্রাথমিক রূপরেখা ঠিক হয়

বাংলাদেশের পক্ষে আরও ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব নাজনীন কাউসার চৌধুরী। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছিলেন সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চ।


যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশের ভূমিকা

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬২৬ কোটি ডলার। এ ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ নিচ্ছে একাধিক পদক্ষেপ:

  • সরকারি পর্যায়ে প্রতি বছর ৭ লাখ টন করে মোট ৩৫ লাখ টন গম আমদানির চুক্তি

  • যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানি বাড়ানো

  • বোয়িং কোম্পানি থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ আমদানির পরিকল্পনা

  • তুলা, সয়াবিন বীজ, ডাল—এই সব পণ্য বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়ানো

বাংলাদেশ সরকার আশা করছে, এতে বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা হলেও ভারসাম্য পাবে।


বিশ্লেষণ: এই শুল্ক আমাদের কী বার্তা দিচ্ছে?

এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির কঠোরতা নির্দেশ করছে, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে একটি জাগরণের ঘন্টা। সরকার ও রপ্তানিকারকদের উচিত এখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বাজার খোঁজা, ইইউ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যকে টার্গেট করে নতুন রপ্তানি কৌশল তৈরি করা।

অন্যদিকে কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৫০ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক দোদুল্যমানতা একাধিকবার বাংলাদেশের অবস্থানকে চাপে ফেলেছে। ২০২৫ সালে এসে সেই চক্রের পুনরাবৃত্তি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্র:

  • হোয়াইট হাউস প্রেস ব্রিফিং, ৩১ জুলাই ২০২৫

  • বিজিএমইএ, রপ্তানি পরিসংখ্যান ২০২৪

  • বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি দল বিবৃতি, ১ আগস্ট ২০২৫

  • বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্য ঘাটতি প্রতিবেদন, ২০২৪

  • বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি সম্পর্ক: ইতিহাস ও বর্তমান (১৯৭৫–২০২৫), পরিকল্পনা কমিশন নথি

    প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
    আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency