| বঙ্গাব্দ

শুধু মাদকবাহী নয়, ধরতে হবে গডফাদারদের: মাদক কারবারিদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 03-11-2026 ইং
  • 11807 বার পঠিত
শুধু মাদকবাহী নয়, ধরতে হবে গডফাদারদের: মাদক কারবারিদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব
ছবির ক্যাপশন: মাদক নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ

মাদক নিয়ন্ত্রণে কারবারিদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব রেলওয়ে পুলিশ প্রধানের

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালিয়ে বাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি (চার্জ) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান। তাঁর মতে, মাদক সরবরাহের মূল হোতা, অর্থায়নকারী এবং নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মাদক কারবারিদের দ্রুত শনাক্ত করতে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের উপযোগী একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমিতির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘পলিসি ডায়ালগ অন এ ড্রাগ ফ্রি বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অ্যাকশন’ শীর্ষক নীতিসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাদকের মূল হোতাদের শনাক্ত করার আহ্বান

ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে শুধু বাহক কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করলে পুরো অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। মাদকের চালান কোথা থেকে আসছে, কারা অর্থের জোগান দিচ্ছে এবং কারা আড়ালে থেকে পুরো ব্যবসা পরিচালনা করছে, সেসব বিষয় অনুসন্ধান করতে হবে।

তিনি বলেন, মাদক কারবারিদের তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দ্রুত কোনো সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীর পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করতে পারবে।

এ জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মাদক পরিবহনে রেলপথও নজরদারির চ্যালেঞ্জ

রেলওয়ে পুলিশ প্রধান বলেন, মাদক কারবারিরা নিজেদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও বিস্তারের জন্য পরিবহনের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে। রেলপথও মাদক পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীর যাতায়াত এবং বিভিন্ন স্টেশনে মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। তবে রেলওয়ে পুলিশ নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা তৈরি, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, প্রশাসন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সচেতনতা ও কাউন্সেলিং বাড়ানোর তাগিদ

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের মধ্যে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা প্রয়োজন।

কোনো শিক্ষার্থী মাদকে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে শুধু শাস্তি দেওয়ার কথা না ভেবে এর পেছনের কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। এ জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় মাদক কেনাবেচা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারিকে একভাবে দেখার সুযোগ নেই

ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল বলেন, মাদকবিষয়ক সংবাদ প্রকাশে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করলে তাঁর সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, মাদকাসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। তাই মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য রেখে সংবাদ পরিবেশন করা জরুরি।

হারুন জামিল আরও বলেন, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে সমাজের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। তাঁর মতে, হতাশা ও মূল্যবোধের অভাব অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তদন্তের দাবি

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

মাদক কারবারের সঙ্গে প্রভাবশালী কোনো মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। শুধু দৃশ্যমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মাদকের বিস্তার বন্ধ করা যাবে না। বরং মাদক সরবরাহের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো চিহ্নিত করে তা ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক পরিচয়ের কারণে কেউ যেন আইনের বাইরে থাকার সুযোগ না পায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাদক কারবারিদের তথ্য দিলে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাবের মো. সোয়াইব বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হলেও শুধু অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, মাদক কারবারিদের বিষয়ে অনেক সময় সাধারণ মানুষ তথ্য দিতে চান না। কারণ, অভিযোগ জানানোর পর নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করে। এ সমস্যা সমাধানে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের আস্থা অর্জন জরুরি।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসন ‘হ্যালো ডিসি’ নামে একটি নাগরিক সেবার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে বলেও জানান তিনি।

মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় পরিবারকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ

রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হসপিটালের মনোরোগ বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. এস এম কবির জুয়েল বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে শুধু ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায় না। এর পাশাপাশি কাউন্সেলিং, পরিবারের সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মনোসামাজিক চিকিৎসা প্রয়োজন।

তিনি জানান, মাদকাসক্তির চিকিৎসায় রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সম্পৃক্ত করা জরুরি। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও পুনরায় মাদকে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে নিয়মিত ফলোআপ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

দেশের মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর সেবার মান উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কাউন্সেলরের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

তাঁর মতে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয় না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে।

উপসংহার

নীতিসংলাপে বক্তারা মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযাননির্ভর পদ্ধতির পাশাপাশি অপরাধী চক্রের অর্থায়ন, সরবরাহব্যবস্থা ও সাংগঠনিক কাঠামো শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, গোয়েন্দা সমন্বয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। বক্তাদের মতে, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency