ব্যর্থতার অভিযোগে স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের, পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী ঘেরাওয়ের হুশিয়ারি
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
দেশে ক্রমবর্ধমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, লাগামহীন খুন, লুটতরাজ, অরাজকতা, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণের তীব্র প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিশাল গণবিক্ষোভ সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই দুই ব্যর্থ মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে সারা দেশে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সেই আন্দোলন ও বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘেরাও করে এই দাবি আদায় করা হবে ইনশাআল্লাহ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক জমকালো গণবিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই কঠোর আলটিমেটাম দেন। ‘দেশব্যাপী সরকার প্রযোজিত খুন, লুটতরাজ, অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
জনজীবনের চরম দুর্ভোগ ও সরকারের ব্যর্থতার চিত্র
সমাবেশের শুরুতেই বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বিগত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের দলের নেতাদের মতবিনিময় এবং সাধারণ মানুষের না পাওয়ার কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমরা গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার অলিগলিতে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি, তাদের কথা শুনেছি। মানুষের মুখ থেকে উঠে এসেছে সীমাহীন দুর্ভোগ ও কান্নার চিত্র। আজ বাসাবাড়িতে গ্যাস নেই, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, সন্ত্রাস ও রাহাজানিতে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অথচ এর প্রতিকারে সরকার সম্পূর্ণ নির্বিকার।”
দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি এবং সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ভয়াবহ ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি যার ওপর বর্তায়, তিনি হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। আজ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল দপ্তরের পূর্ণ দায়িত্ব পালন বাদ দিয়ে নিজের মনগড়া উপায়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।”
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা এবং ঐতিহাসিক জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে তাদের সুনির্দিষ্ট রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই জনগণের গণভোটের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সংবিধান কাটাছেঁড়ার যে খেলায় মেতে উঠেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আজ আমরা সুনির্দিষ্ট সেই ব্যর্থতার দায়ে তাঁর পদত্যাগের এক দফা দাবিতে শাহবাগে সমবেত হয়েছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুাকেও অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, তাঁরা দুজনেই তাঁদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।”
প্রধানমন্ত্রী ঘেরাওয়ের হুশিয়ারি
সরকারকে হুশিয়ার করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে যে প্রশাসনিক নৈরাজ্য, খুন ও অপরাধের মহোৎসব চলছে, এই সার্বিক ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে হবে। তাঁরা যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন, তবে দেশের বিভাগ থেকে শুরু করে তৃণমূল সর্বত্র তীব্র গণআন্দোলনের মিছিল বের করা হবে। সেই লক্ষাধিক মানুষের বিক্ষুব্ধ মিছিল নিয়ে আমরা সরাসরি জনাব তারেক রহমানকে (প্রধানমন্ত্রী) ঘেরাও করে আমাদের এই যৌক্তিক পদত্যাগের দাবি আদায় করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।”
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপির মনোনীত দুই মেয়র প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সরব উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই বিশাল গণবিক্ষোভ সমাবেশে কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনের চত্বর ও এর আশপাশের রাজপথ লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে এবং তীব্র জনস্রোতের সৃষ্টি হয়।