প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে জাদুকরি নৈপুণ্যে সম্মোহিত করে রাখার পর অবশেষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক আকাশি-সাদা জার্সিটি চিরতরে তুলে রাখলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। আজ বুধবার (০৭ অক্টোবর) বুয়েনস আয়ার্সের আইকনিক ‘এস্তাদিও মনুমেন্তাল’ স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজারেরও বেশি দর্শকের অশ্রুসজল ও হর্ষধ্বনিতে ঘেরা পরিবেশে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন তিনি।
বেনিনের বিপক্ষে এই আবেগঘন প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। নিজের ২০৮তম এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও নিজের জাত চেনাতে একটুও ভুল করেননি ৩৯ বছর বয়সি এই ফুটবল মহাতারকা। ম্যাচের ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোলটি করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন বাকি দুটি গোল। এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচটিকে এক অনন্য উচ্চতায় রাঙিয়ে বিদায় নিলেন জাতীয় দলের এই বিশ্বকাপজয়ী মহানায়ক।
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনজনিত জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। অত্যন্ত ব্যয়বহুল সেই চিকিৎসার খরচ বহন করা যখন তার পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার পাশে এসে দাঁড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে তারা মেসিকে নিয়ে যায় তাদের বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’-তে।
পরবর্তীতে বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে ১৭টি বর্ণাঢ্য মৌসুমে ক্লাবটিকে অসংখ্য সাফল্য এনে দেন তিনি। ক্লাবটির জার্সিতে ১০টি লা লিগা ও ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ দুই ডজনেরও বেশি মেজর ট্রফি অর্জনের পাশাপাশি ২০১২ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ ৯১টি গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন। পরবর্তীতে ফরাসি ক্লাব পিএসজি ঘুরে ২০২৩ সালে তিনি যোগ দেন মার্কিন ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে, যেখানে প্রথম মৌসুমেই দলকে লিগস কাপ এবং পরবর্তীতে এফসি কাপের শিরোপা এনে দেন।
ক্লাব ফুটবলে আকাশচুম্বী সাফল্য পেলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে দীর্ঘদিন বড় কোনো ট্রফি না জেতায় ক্যারিয়ারের একটি বড় সময় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল মেসিকে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হ্রদয়বিদারক পরাজয়ের পর ২০১৬ সালে ক্ষোভে ও অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
তবে সমর্থকদের ভালোবাসায় দেশবাসীর টানে দ্রুতই জাতীয় দলে ফিরে আসেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এক অপ্রতিরোধ্য ও সোনালী দল। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হওয়া লিওনেল মেসি দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক মেজর ট্রফির স্বাদ পান ২০২১ সালে। সে বছর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারিয়ে ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনাকে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেন তিনি।
এর ঠিক পরের বছর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে রোমাঞ্চকর টাইব্রেকারে পরাজিত করে ৩৬ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন পরম আরাধ্য বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি। এরপর ২০২৪ সালে আমেরিকার মাটিতে কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো মহাদেশীয় শিরোপা উঁচিয়ে ধরেন মেসি। যদিও ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অল্পের জন্য হেরে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় দলকে, তবুও ব্যক্তিগতভাবে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ২১টি গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি পাকা করেন এই ক্ষুদে জাদুকর।
জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন মেসি। অবশেষে বেনিনের বিপক্ষে ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’ খ্যাত নিজের শেষ ম্যাচটি শেষ হতেই স্টেডিয়ামের পুরো আকাশ ঝলসে ওঠে এক অভাবনীয় ড্রোন শো-এর আলোয়, যেখানে আকাশে ভেসে ওঠে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মেসির সেই ঐতিহাসিক ও অমর মুহূর্তটি।
ম্যাচ শেষে বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মেসি বলেন—
“আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামাটা যেকোনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি। আমার ইচ্ছা করে এই অনুভূতিটা সারাজীবন ধরে রাখি, কিন্তু বিদায় নেওয়ার সঠিক সময় এটাই। আমি সবসময় এই জার্সির জন্য আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি।”
উল্লেখ্য, জাতীয় দল ও দেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও মাঠের ফুটবলকে এখনই বুঁদ করে রাখছেন না রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি'অর ও ছয়বারের ইউরোপীয় গোল্ডেন শু জয়ী এই জীবন্ত কিংবদন্তি। তিনি আমেরিকার ক্লাব ইন্টার মায়ামির হয়ে তার পেশাদার ক্লাব ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়মিত চালিয়ে যাবেন।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |