প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত আর কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের দ্বিপক্ষীয় লড়াইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর সামরিক ময়দান ছাড়িয়ে অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতির এক বৃহত্তর কৌশলগত লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। আর এই পুরো ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে চীন।
বেইজিং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও, ইরানের সঙ্গে তাদের গভীর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা কৌশলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইরান তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই সরবরাহ করে চীনের কাছে। এর বড় একটি অংশ যায় চীনের ছোট ও স্বাধীন ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোতে, যেগুলোর আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা কম।
সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান ও চীনের মধ্যে তেল ও পণ্য বিনিময়ের একটি গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থায় প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এড়িয়ে চীনা পণ্য, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও যানবাহনের বিনিময়ে তেল সরবরাহ করছে তেহরান। ফলস্বরূপ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানকে পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা ওয়াশিংটনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের তেল বাণিজ্য ও অস্ত্র সংগ্রহের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ ও উপাদান দেওয়ার অভিযোগে চীন, হংকং, রাশিয়া ও পাকিস্তানভিত্তিক ১৩টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। একই সঙ্গে চীনা ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোর ব্যাপারেও কড়া সতর্কতা জারি করেছে ওয়াশিংটন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি চীনের বড় ব্যাংক বা আর্থিক খাতকে নিশানা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে চীন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বা যুদ্ধ বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্বে বেইজিংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত হিসাবনিকাশ করে এগোচ্ছে। একদিকে তেহরানের পতন বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় চীন চায় না, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হোক—তাও বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক স্বার্থের অনুকূলে নয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাতকে চীন কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বেইজিং তেহরানের প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অবলম্বন করছে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ আজ এক নতুন ভূরাজনৈতিক দ্বৈরথের জন্ম দিয়েছে—যেখানে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করছে, অন্যদিকে চীন বাণিজ্য, জ্বালানি ক্রয় এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। বেইজিংয়ের এই অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক কৌশল শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের চাপ কতটা ব্যর্থ করতে পারে, তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎই নয়, বরং আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতির গতিপথও নির্ধারণ করবে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |