আন্তর্জাতিক ও মধ্যপ্রাচ্য ডেস্ক
সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুলাই, ২০২৬
গাজায় এক হাজার দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ শুধু সেখানকার সাজানো শহর, আধুনিক হাসপাতাল আর শরণার্থী শিবিরগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়নি; এটি ফিলিস্তিনের তিন দশকের পুরোনো প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর চরম সীমাবদ্ধতা ও অসারতাকেও বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৩ সালের ঐতিহাসিক ‘অসলো চুক্তির’ (Oslo Accords) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন আর দেশটির সাধারণ মানুষের বর্তমান বাস্তবতা ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ বা মহা-বিপর্যয়ের পর ফিলিস্তিনিরা বর্তমানে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও কঠিন সময় পার করছে। কিন্তু এমন মহাক্রান্তিলগ্নেও ফিলিস্তিনের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চরমভাবে বিভক্ত, অকার্যকর এবং সংস্কারবিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো এই দীর্ঘ সময়ে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে দখলদারিত্বের থাবা আরও শক্ত করেছে ইসরাইল:
পশ্চিম তীরের সংকট: আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের গতি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেরুজালেম সংযুক্তিকরণ: পূর্ব জেরুজালেমকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ইসরাইলি সংযুক্তিকরণের (Annexation) প্রক্রিয়া বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে।
গাজার অবরুদ্ধ জীবন: গত তিন দশকের একটি বড় সময় ধরে গাজা উপত্যকাকে স্থায়ী সামরিক অবরোধের মুখে রেখে ধুঁকে ধুঁকে মরতে বাধ্য করা হয়েছে, যার চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে চলমান এই ১০০০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
বর্তমানে ফিলিস্তিনি আইনসভা (PLC) কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ বহু বছর ধরে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটির (PA) গ্রহণযোগ্যতা এখন সাধারণ জনগণের কাছে শূন্যের কোঠায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই গভীর সংকটটি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ব্যক্তিগত নেতৃত্বের দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন মূল প্রশ্ন হলো— ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব ও সার্বিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে।
২০০৬ সালের সর্বশেষ আইনসভা নির্বাচনে হামাস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এরপর আর কোনো নির্বাচন না হওয়ায় সেই জনসমর্থনের নতুন কোনো গণতান্ত্রিক পরীক্ষা হয়নি। তবে গত ১০০০ দিন ধরে গাজা প্রশাসন পরিচালনা, ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা, বন্দি বিনিময় এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সম্মুখ প্রতিরোধ আন্দোলনে সরাসরি সক্রিয় ভূমিকার কারণে হামাস এখনো ফিলিস্তিনি রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে টিকে আছে।
🇵াল ফিলিস্তিনি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান শক্তি ও অবস্থান:
• ফাতাহ (Fatah): ঐতিহ্যবাহী এই মূল রাজনৈতিক আন্দোলনটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল, দুর্নীতি ও শক্তিশালী নেতৃত্ব সংকটে পড়ে চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
• হামাস (Hamas): নির্বাচনি ম্যান্ডেট ও গাজায় সামরিক প্রতিরোধের কারণে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য ও প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
• ইসলামিক জিহাদ (PIJ): নির্বাচনি রাজনীতির বাইরে থাকলেও পশ্চিম তীর ও গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বর্তমানে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু একটি লোকদেখানো সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করলেই সংকটের সমাধান হবে না। বরং এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থবহ রাজনৈতিক পুনর্গঠন।
ভবিষ্যতের পথ তৈরি হতে পারে মূলত তিনটি প্রধান পদক্ষেপের মাধ্যমে। প্রথমত, ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা বা পিএলও (PLO)-এর ব্যাপক প্রশাসনিক ও গাঠনিক সংস্কার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোকে এই জাতীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে একটি একক জাতীয় ফ্রন্ট গঠন করতে হবে। এবং তৃতীয়ত, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বিশাল ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।
গাজার ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তা হলো— গাজা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, শরণার্থী শিবির ও প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের নিয়ে একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নের সঠিক উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ও তার ভবিষ্যৎ গতিপথ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |