| বঙ্গাব্দ

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের ‘প্রজনন গণহত্যা’; জাতিসংঘের উদ্বেগ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 02-07-2026 ইং
  • 9704 বার পঠিত
ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের ‘প্রজনন গণহত্যা’; জাতিসংঘের উদ্বেগ
ছবির ক্যাপশন: প্রজনন গণহত্যা

আরব নারীর গর্ভই ইসরাইলের সবচেয়ে বড় ভয়’; গাজায় অ্যানেসথেসিয়া ছাড়া সিজার ও প্রসূতি কেন্দ্র ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ২ জুলাই, ২০২৬

কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর সুপরিকল্পিতভাবে ‘প্রজনন গণহত্যা’ (Reproductive Genocide) চালিয়ে আসছে ইসরাইল। চিকিৎসা অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, প্রসূতি ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা এবং পরিবেশকে রাসায়নিক ও বিষাক্ত অস্ত্রের মাধ্যমে এমন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিতে ফিলিস্তিনিদের মাঝে বন্ধ্যত্ব দেখা দিচ্ছে। ‘ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভ’ নামক সংস্থার এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব লোমহর্ষক তথ্য উঠে এসেছে।

প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনালের প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রস্তুত করা ১৮৮ পৃষ্ঠার এই বিশেষ প্রতিবেদনটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে—‘এ প্রিডেটরি স্টেট: ইসরাইলি সিস্টেমিক সেক্সুয়ালাইজড অ্যান্ড জেন্ডারড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট প্যালেস্টাইনস’ (একটি শিকারি রাষ্ট্র: ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের পদ্ধতিগত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা)। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে পরিচালিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এই অকাট্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

৭ অক্টোবরের পর নিধনযজ্ঞের তীব্রতা বৃদ্ধি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরাইলি নিধনযজ্ঞ শুরু হলে এই প্রজনন গণহত্যার চর্চা আরও কয়েক গুণ ত্বরান্বিত হয়। ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং নতুন প্রজন্মের জন্মপ্রক্রিয়াকে চিরতরে অসম্ভব করে তোলাই ইসরাইলের মূল উদ্দেশ্য।

বিগত সপ্তাহে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল বিষয়ক জাতিসংঘের শীর্ষ তদন্ত সংস্থাও একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছে জানিয়েছে, গাজায় হামলার প্রধান অংশ হিসেবে ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্নিপার ও ড্রোনের মাধ্যমে নিখুঁত মাথায় গুলি, আটক অবস্থায় শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন, প্রজননগত সহিংসতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংসের মতো যুদ্ধাপরাধের বিষয়গুলো নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

শিশুমৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান: জাতিসংঘের তথ্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এই পর্যন্ত ইসরাইল ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে সরাসরি হত্যা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরও অন্তত ৫ হাজার ১৬০ জন শিশু এখনো বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ও চাপা পড়ে আছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্তই অন্তত ১৫ হাজার শিশু তাদের জন্মদাত্রী মাকে হারিয়ে এতিম হয়েছে।

ইনকিউবেটরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন: চার নবজাতকের পচাগলা লাশ

ইসরাইলি বর্বরতার একটি নির্মম উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার আল-নাসর শিশু হাসপাতালে ইসরাইলি বাহিনী জোরপূর্বক বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ইনকিউবেটরে থাকা চার নবজাতকের শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে বিকল হয়ে যাওয়া লাইফ সাপোর্ট মেশিনের সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থাতেই হাসপাতাল কক্ষ থেকে তাদের পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

গণহত্যার শুরুতে জাতিসংঘের হিসাবে গাজায় ৫০ হাজারেরও বেশি অন্তঃসত্ত্বা নারী ছিলেন এবং প্রতি মাসে গড়ে ৫ হাজার ৫০০ শিশু জন্ম নিচ্ছিল। কিন্তু ইসরাইলের সর্বাত্মক অবরোধ ও হামলার কারণে গর্ভবতী মায়েদের জরুরি চিকিৎসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গাজায় গর্ভপাতের হার ৩০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। ব্যাপক অনাহার, তীব্র অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা এবং প্রসবপূর্ব প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে অকাল জন্ম (Pre-mature birth), কম ওজনের শিশু এবং প্রসবের সময় মারাত্মক রক্তক্ষরণের কারণে শত শত মায়ের মৃত্যু হয়।

অ্যানেসথেসিয়া ছাড়াই সিজারিয়ান অপারেশন

গাজার হাসপাতালগুলোতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, অ্যানেসথেসিয়া বা জীবাণুমুক্ত করার সরঞ্জাম না থাকায় ফিলিস্তিনি নারীরা অত্যন্ত নোংরা ও ভিড়ভাট্টাপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র, খোলা ঘরবাড়ি বা ধ্বংসস্তূপে ঘেরা রাস্তায় সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গাজায় কাজ করা আন্তর্জাতিক চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তারা কোনো অবশ করার ওষুধ (অ্যানেসথেসিয়া) ছাড়াই শত শত নারীর সিজারিয়ানসহ নানা জটিল অস্ত্রোপচার করতে বাধ্য হয়েছেন, যা চরম অমানবিক।

এছাড়া ইসরাইল গাজার সব প্রসূতি ওয়ার্ড, নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (NICU) এবং আইভিএফ (IVF) ফার্টিলিটি ক্লিনিকগুলো নিখুঁতভাবে বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত নিষিদ্ধ সাদা ফসফরাস এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের কারণে ফিলিস্তিনিদের প্রজননক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বংশানুক্রমিক মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে ফেমিনিস্ট কালেক্টিভ সতর্ক করেছে।

‘ফিলিস্তিনি শিশুর জন্মই ইসরাইলের দুঃস্বপ্ন’

ফিলিস্তিনিদের বংশবৃদ্ধি নিয়ে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বর্ণবাদী ভয়ের বিষয়টিও এই প্রতিবেদনে খতিয়ানসহ টেনে আনা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে ইসরাইলি প্রখ্যাত ভূগোলবিদ আরনন সোফার স্পষ্ট সতর্ক করে বলেছিলেন, "ইসরাইল রাষ্ট্র হিসেবে সবচেয়ে বড় যে জনমিতিক (Demographic) হুমকির সম্মুখীন, তা হলো আরব নারীদের গর্ভ।" তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্মহারকে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি বলে আখ্যা দেন। এমনকি ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার এক সাক্ষাৎকারে নির্লজ্জভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, "আরও একটি ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নিতে যাচ্ছে—এই ভাবনা থেকেই প্রতি রাতে আমার দুঃস্বপ্ন শুরু হতো।"

জাতিসংঘের বিশেষ দূতের প্রতিক্রিয়া

ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভের এই যুগান্তকারী প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের জন্য নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটি এমন একটি অপরাধী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর অকাট্য অভিযোগ, যা ফিলিস্তিনিদের জীবন—দেহ, বসতবাড়ি, পরিবার, প্রজননগত অস্তিত্ব এবং এমনকি মৃতদেহকেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।"

তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি জাতিকে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।

এক নজরে ইসরাইলের ‘প্রজনন গণহত্যা’র খতিয়ান (জুলাই, ২০২৬)

  • মূল অপরাধ: ফিলিস্তিনিদের জনসংখ্যা রুখতে ইসরাইলের পরিকল্পিত ‘প্রজনন গণহত্যা’ ও বন্ধ্যত্ব তৈরি

  • শিশুমৃত্যু: ২০৩ সালের অক্টোবর থেকে এই পর্যন্ত ২১,০০০-এর বেশি শিশু নিহত এবং ৫,১৬০ জন ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজ।

  • ভয়াবহ পরিস্থিতি: চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অ্যানেসথেসিয়া ছাড়াই গাজায় শত শত নারীর সিজারিয়ান অপারেশন

  • গর্ভপাত: অপুষ্টি, অনাহার এবং ওষুধের অভাবে গাজায় গর্ভপাতের হার ৩০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি

  • ঐতিহাসিক ভয়: আরব নারীদের গর্ভ ও ফিলিস্তিনি শিশুর জন্মকে নিজেদের জন্য দুঃস্বপ্ন মনে করত ইসরাইল

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ডেস্ক | মধ্যপ্রাচ্য ও মানবাধিকার বিষয়ক বিভাগ

গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর চলমান যুদ্ধাপরাধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) দায়েরকৃত মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি, অবরুদ্ধ উপত্যকায় জাতিসংঘের জরুরি শিশুখাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা তহবিলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মহলের সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency