| বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়নের ৭ বছরের কারাদণ্ড

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-06-2026 ইং
  • 3616 বার পঠিত
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়নের ৭ বছরের কারাদণ্ড
ছবির ক্যাপশন: সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন

হীরার নেকলেস থেকে সোনার কচ্ছপ, সব বাজেয়াপ্ত; সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হি-র কারাদণ্ডে সিউলে তোলপাড়

আন্তর্জাতিক ও এশীয় কূটনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬

দক্ষিণ কোরিয়ার সদ্য ক্ষমতাচ্যুত ও অভিশংসিত সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের বহুল বিতর্কিত স্ত্রী ও দেশটির সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হি-কে (Kim Keon-hee) ঘুষের বিনিময়ে একের পর এক বিলাসবহুল উপহার গ্রহণের দায়ে সাত বছরের (৭) সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন সিউলের একটি শীর্ষ আদালত।

শুক্রবার (২৬ জুন) সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের (Seoul Central District Court) বিজ্ঞ বিচারক জো সুন-পিয়ো এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে বলেন, রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ধর্মীয় গুরুদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রত্যক্ষ বিনিময়ে কিম মূল্যবান উপহার ও উপঢৌকন গ্রহণ করেছিলেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ ও কোরীয় দণ্ডবিধির পরিপন্থী।

৪ বছরের সাজা ভেঙে এবার ৭ বছরের ধাক্কা

উল্লেখ্য, এর আগে সম্পূর্ণ পৃথক একটি মামলায় প্রভাবশালী ইউনিফিকেশন চার্চের কাছ থেকে বিতর্কিত উপহার গ্রহণ এবং শেয়ারবাজারে কারসাজি (Stock Manipulation) করে অবৈধভাবে কোটি কোটি ওন লাভবান হওয়ার গুরুতর অভিযোগে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আপিল আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। সেই সাজার মেয়াদ কাটার মধ্যেই আজ নতুন করে যুক্ত হলো এই সাত বছরের কারাদণ্ডের ঐতিহাসিক রায়।

রায় ঘোষণার সময় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারক জো সুন-পিয়ো এজলাসে বলেন:

"রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও সাংবিধানিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির নৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সংযম, স্বচ্ছতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। কিন্তু কিম কিয়ন হি সেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব ও পদবি কাজে লাগিয়ে বারবার প্রভাবশালী মহল থেকে অত্যন্ত মূল্যবান উপহার গ্রহণ করেছেন, যা কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয়।"

আদালত রায় প্রদানের পাশাপাশি সাবেক ফার্স্ট লেডির কাছ থেকে জব্দ ও উদ্ধার হওয়া সমস্ত দামি উপহার রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত হওয়া সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে— বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলসের (Van Cleef & Arpels) খাঁটি হীরার নেকলেস, টিফানির (Tiffany & Co.) ব্রোচ, ডিওরের (Dior) বহুমূল্য হ্যান্ডব্যাগ, নিরেট সোনার তৈরি ঐতিহ্যবাহী কচ্ছপের মূর্তির সংরক্ষণ বাক্স এবং দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান বিমূর্ত শিল্পী লি উফানের একটি কোটি টাকা মূল্যের চিত্রকর্ম।

হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে রায় শুনলেন কিম

শুক্রবার আদালতে রায় শুনানির সময় ধূসর রঙের আনুষ্ঠানিক স্যুট ও মুখে সাদা মাস্ক পরে হাজির হন একসময়ের প্রতাপশালী ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হি। আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ সময় মাথা নিচু করে বিচারকের রায় শোনেন তিনি। ইতিপূর্বে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে উপহার বা গিফট নেওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করলেও আজ দাবি করেছেন, সেগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের ব্যাক-ডোর সুবিধা বা তদবির আদায়ের সম্পর্ক ছিল না। গত ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে গ্রেফতারের পর থেকেই সিউলের একটি বিশেষ কারাগারে একাধিক মামলায় তার এই হাই-প্রোফাইল বিচার চলছে। তবে রায়ের পরপরই কিমের প্যানেল আইনজীবীরা এক প্রেস বিবৃতিতে বলেন, কোনো প্রত্যক্ষ ও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই স্রেফ ‘শিথিল আইনি ব্যাখ্যার’ ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই রায় দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা খুব দ্রুত উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

যেভাবে ক্ষমতা হারাল ইউন প্রশাসন

দক্ষিণ কোরিয়ার এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির শুরু মূলত গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল দেশে আকস্মিকভাবে একনায়কতান্ত্রিক ‘সামরিক আইন’ (Martial Law) জারি করার পর দেশটির পার্লামেন্টে অভিশংসনের (Impeachment) শিকার হন এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা থেকে চূড়ান্তভাবে অপসারিত হন। বর্তমানে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউনের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহ বা বিদ্রোহ, অবৈধভাবে সামরিক আইন জারি এবং চিরবৈরী উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের ওপর সামরিক ড্রোন উড়িয়ে যুদ্ধাবস্থা ও তীব্র উত্তেজনা তৈরির একাধিক মামলায় বিচার চলছে। ইতিমধ্যে একটি বিদ্রোহের মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্য মামলায় ৩০ বছরের সাজার আদেশ দেওয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে তিনি বর্তমানে উচ্চ আদালতে আপিল বিভাগে লড়ছেন।

ইউন সুক ইওলের পতনের পর দেশটির স্থলাভিষিক্ত বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং (Lee Jae-myung) ক্ষমতায় এসেই সাবেক ইউন প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও ফার্স্ট লেডি কিম কিয়নের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন মেগা দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে একাধিক শক্তিশালী বিশেষ টাস্কফোর্স ও স্বাধীন বিশেষ কৌঁসুলি নিয়োগের অনুমোদন দেন।

জামাতার সরকারি পদ নিশ্চিতের ‘হীরার চুক্তি’

আদালতের নথি ও বিশেষ কৌঁসুলির দাখিলকৃত অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে সিওহি কনস্ট্রাকশনের (Seohui Construction) ধনকুবের চেয়ারম্যান লি বং-কোয়ানের কাছ থেকে ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হি প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ ওন (প্রায় ৯০ হাজার মার্কিন ডলার) মূল্যের একটি রাজকীয় হীরার নেকলেস ও অন্যান্য দামি গয়না উপহার নেন। অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, এই নেকলেস গ্রহণের বিনিময়ে চেয়ারম্যানের আপন জামাতার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার একটি অত্যন্ত লোভনীয় সরকারি উচ্চপদ নিশ্চিত করার গোপন চেষ্টা করেছিলেন কিম। আদালত আজ এই অভিযোগটিকে শতভাগ সত্য ও প্রমাণিত বলে রায় দেন। একই অপরাধে মূল ঘুষদাতা ব্যবসায়ী লি বং-কোয়ানকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তার বয়স বিবেচনায় তা দুই বছরের জন্য স্থগিত (Suspended Sentence) রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া সিউল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট কিমকে আরও কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘুষের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে— সরকারের হাই-টেক ‘রোবোটিক কুকুর’ প্রজেক্টে রাষ্ট্রীয় কোটি কোটি ডলারের অনুদান বা সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশী এক উদীয়মান ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দামি হাতঘড়ি গ্রহণ, রাষ্ট্রপতির সরকারি বিদেশ সফরে প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্তির আশায় এক প্রভাবশালী খ্রিষ্টান পাদ্রির কাছ থেকে নেওয়া ডিওরের ব্যাগ এবং সোনার কচ্ছপের মূর্তি।

এক নজরে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডির সাজা ও অপরাধের খতিয়ান (জুন, ২০২৬)

  • চূড়ান্ত রায়: সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট কর্তৃক ফার্স্ট লেডি কিম কিয়ন হি-কে ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান।

  • মূল অপরাধ: হীরার নেকলেস, ডিওর হ্যান্ডব্যাগ ও দামি ঘড়ি ঘুষ নিয়ে সরকারি বড় পদ পাইয়ে দেওয়ার তদবির।

  • বাজেয়াপ্ত সম্পদ: ভ্যান ক্লিফ হীরার নেকলেস, টিফানি ব্রোচ, সোনার কচ্ছপ এবং বিখ্যাত চিত্রশিল্পী লি উফানের ছবি।

  • প্রেক্ষাপট: ২০২৫ সালের এপ্রিলে সামরিক আইন জারির দায়ে ক্ষমতা হারানো প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের স্ত্রী তিনি।

  • বর্তমান প্রেসিডেন্ট: বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটির তদন্তেই ফেঁসে যান কিম কিয়ন।


বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের যাবজ্জীবন মামলার আপিলের লাইভ আপডেট, সিউল সুপ্রিম কোর্টে কিম কিয়নের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ, পিয়ংইয়ং-সিউল সীমান্ত উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency