১৪২ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। উচ্চ যুব বেকারত্বসহ নানা তীব্র আর্থসামাজিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী রাজনৈতিক মিত্র ও নীতি-নির্ধারকেরা এখন জনসংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে এক অভিনব অবস্থান নিয়েছেন। জন্মহারের আশঙ্কাজনক পতন ঠেকাতে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতা রুখতে তাঁরা নাগরিকদের বড় পরিবার গঠনে বা বেশি সন্তান নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করছেন।
যদিও জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যা আগামী আরও চার দশক ধরে বাড়তে থাকবে এবং তা সর্বোচ্চ ১৭০ কোটিতে পৌঁছাবে; তবুও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং কিছু রাজ্য সরকারের দাবি—ছোট পরিবার গঠনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। আর এ জন্য প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া শুরু হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সামা টিভি ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের বরাতে ভারতের এই নীতি পরিবর্তনের আদ্যোপান্ত নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
ভারতে গত কয়েক দশকে পরিবার পরিকল্পনা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে জন্মহার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে:
১৯৯২-৯৩ সালের চিত্র: সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতে নারীপ্রতি গড় সন্তান জন্মদানের হার (Total Fertility Rate - TFR) ছিল ৩ দশমিক ৪।
২০১৯-২১ সালের চিত্র: গর্ভনিরোধকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং নারীদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই হার কমে ২-এ নেমে এসেছে।
উদ্বেগের কারণ: সরকারি হিসাব ও জনসংখ্যা বিজ্ঞানীদের মতে, একটি দেশের জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখতে বা প্রতিস্থাপনের (Replacement Level) জন্য এই জন্মহার অন্তত ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন। ভারত ইতোমধ্যে সেই বেঞ্চমার্কের নিচে নেমে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমিয়ে দেবে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ—যেখানে মোদির দল (BJP) ও আঞ্চলিক দল টিডিপির (TDP) জোট সরকার ক্ষমতায় রয়েছে—গত সপ্তাহান্তে এক অভিনব আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে:
৩য় সন্তানের জন্য: পরিবারগুলোকে এককালীন ৩০ হাজার রুপি (প্রায় ৩১১.৫৭ ডলার) দেওয়া হবে।
৪র্থ সন্তানের জন্য: এককালীন ৪০ হাজার রুপি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। (উল্লেখ্য, এর আগে দ্বিতীয় সন্তানের জন্য ২৫ হাজার রুপির প্রস্তাব থাকলেও, প্রথম সন্তানের জন্য কোনো সরাসরি সহায়তার কথা বলা হয়নি)।
রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু বলেন, "বিশ্বের অনেক দেশেই জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে প্রবীণ বা বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা বড় অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করছে। অতীতে আমরা পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করেছি। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা চাই এখন থেকে সন্তানকে যেন কেবল 'দায়' না ভেবে 'সম্পদ' হিসেবে দেখা হয়।"
অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি রাজ্য সিকিমও জনসংখ্যা বাড়াতে আকর্ষণীয় প্রণোদনা দিচ্ছে। তারা চাকরিজীবী দম্পতিদের জন্য এক বছরের মাতৃত্বকালীন ছুটি, এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং আইভিএফ (In-Vitro Fertilization) পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল যে মূল আদর্শিক সংগঠন থেকে উঠে এসেছে, সেই প্রভাবশালী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-ও বড় পরিবার গঠন করাকে ভারতের জন্য একটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে সতর্ক করে বলেন, "আমরা বলি ভারত তরুণদের দেশ... কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের জন্মহার কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যার এই ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করবে।" বিশেষ করে ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক আসনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি প্রচ্ছন্ন ভয়ও এর নেপথ্যে কাজ করছে।
জাতিসংঘের ডেটা অনুযায়ী, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক তাদের জন্মহার খুব বেশি মনে করে তা কমানোর কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০১৫ সালের মধ্যে তারা সবাই নীতি পরিবর্তন করে জন্মহার বাড়ানোর প্রচারণা ও মেগা-প্রণোদনা শুরু করে। ভারত মূলত সেই দূরবর্তী সংকট এড়াতে আগাম পদক্ষেপ নিচ্ছে।
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| ভারতের সামগ্রিক বেকারত্ব (২০২৫) | ৩.১% |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের বেকারত্ব | ৯.৯% |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| শহরাঞ্চলে যুব বেকারত্ব | ১৩.৬% |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
| গ্রামাঞ্চলে যুব বেকারত্ব | ৮.৩% |
+------------------------------------+--------------------------------------------------+
প্রধান দ্বন্দ্ব: সমালোচকেরা বলছেন, যেখানে ২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী ভারতের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে সামগ্রিক বেকারত্ব প্রায় ১০ শতাংশ (শহরাঞ্চলে যা ১৩.৬%) এবং কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট রয়েছে, সেখানে নতুন করে জন্মহার বাড়ানোর এই নীতি হিতে বিপরীত হতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে জনসংখ্যা বাড়ালে তা ভারতের অর্থনৈতিক বোঝা আরও বাড়িয়ে দেবে।
১. আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম: Samaa TV এবং The Times of India — অন্ধ্রপ্রদেশ ও সিকিম সরকারের জনসংখ্যা নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদন (মে ২০২৬)। ২. জাতিসংঘের রিপোর্ট: UN World Population Prospects — ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ ও বৈশ্বিক জন্মহারের তুলনামূলক চিত্র। ৩. সরকারি পরিসংখ্যান: ভারতের জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS-5) এবং শ্রম ব্যুরোর সামগ্রিক যুব বেকারত্ব বিষয়ক বার্ষিক রিপোর্ট (২০২৫-২০২৬)।
উপসংহারে বলা যায়, ১৪২ কোটির দেশ হয়েও ভারতের এই জনসংখ্যা বাড়ানোর নীতি আপাতদৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও ডেমোগ্রাফিক পরিকল্পনা। চীন বা জাপানের মতো "বুড়িয়ে যাওয়া" দেশের তালিকায় নাম লেখানোর আগেই ভারত তার তরুণ জনসংখ্যার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চায়। তবে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে 'সম্পদ' বানাতে হলে মোদি সরকারকে সবার আগে যুব বেকারত্ব দূরীকরণে নজর দিতে হবে।
প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed
পোর্টফোলিও ও যোগাযোগ:
আরও আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক খবরের এসইও ফ্রেন্ডলি আপডেট জানতে ভিজিট করুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |