প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র ১৯০০ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রহর পর্যন্ত বহুবার পুনর্গঠিত হয়েছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এ দেশে এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বীজ বপন করেছিল। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেই সমীকরণে দেখা দিয়েছে নাটকীয় পরিবর্তন। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম কারিগর মাহফুজ আলমের এনসিপিতে যোগ না দেওয়া এবং ১১ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বাংলার রাজনীতির আধুনিক যাত্রা শুরু হয় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব এবং ১৯৪৭-এর দেশভাগের দিকে ধাবিত হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থামেনি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গণতান্ত্রিক ধারা ২০০৭-এর ওয়ান-ইলেভেন এবং পরবর্তীতে ১৫ বছরের একদলীয় শাসনের কবলে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব সেই অচলায়তন ভেঙে দেয়, যা ২০২৬ সালের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত 'জাতীয় নাগরিক পার্টি' (এনসিপি) থেকে মাহফুজ আলমের দূরে থাকাটা ছিল ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় বিস্ময়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম এর কারণ স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, এনসিপি যদি এককভাবে 'তৃতীয় শক্তি' হিসেবে আসত, তবে তিনি যোগ দিতেন। কিন্তু এনসিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে শরিক হওয়ায় তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন।
মাহফুজ আলম বলেন, "মানুষ চাচ্ছিল একটা তৃতীয় শক্তি আসুক, যারা নতুন ও পরিচ্ছন্ন। কিন্তু এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ায় মানুষের সেই আশা ভঙ্গ হয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, জামায়াত এই জোটে লাভবান হলেও এনসিপি বড় ধরনের আস্থাহীনতার চ্যালেঞ্জে পড়বে। বর্তমানে তিনি প্রথাগত রাজনীতি থেকে দূরে থেকে নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক রিমডেলিং নিয়ে কাজ করছেন।
অন্যদিকে, এই জোটের প্রধান চালিকাশক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কুমিল্লার এক সমাবেশে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচিত হলে পরাজিত পক্ষকেও নিয়ে 'ঐক্যের সরকার' গঠন করা হবে। তার মতে, আগামীর বাংলাদেশ হবে তারুণ্যের বাংলাদেশ। জোটের প্রার্থীদের ৬২ শতাংশই যুবক, যা ১৯০০ সাল পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না। ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ই হবে ১১ দলের বিজয়।"
এই বিশাল রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই পটুয়াখালী-০৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক নুর এক আধুনিক ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। দুর্গম অঞ্চলে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে আইসিটি পার্ক স্থাপনের যে স্বপ্ন তিনি দেখাচ্ছেন, তা নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকেই ধারণ করে। অন্যদিকে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া 'মিডিয়া ট্রায়াল'-এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও নৈতিকতার প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। তিনি পদত্যাগের ২০ দিনের মধ্যে সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়ে ত্যাগের এক নতুন উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছেন।
১৯০০ সালে যে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা রূপান্তরিত হয়েছে নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের লড়াইয়ে। মাহফুজ আলমের 'একলা পথ', নুরুল হক নুরের 'উন্নয়ন ইশতেহার' এবং ডা. শফিকুর রহমানের 'ঐক্যের সরকার'—এই ত্রিমুখী ধারার মাঝে বাংলাদেশের ভোটাররা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের চূড়ান্ত রায় দেবেন। জুলাই বিপ্লবের চেতনা কি জোটের রাজনীতিতে বিলীন হবে, নাকি নতুন কোনো তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: মাহফুজ আলমের বিশেষ সাক্ষাৎকার, ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনী ভাষণ, নুরুল হক নুরের ফেসবুক ইশতেহার, আসিফ মাহমুদের ফেসবুক পোস্ট, যুগান্তর ও বাংলাদেশ প্রতিদিন নিজস্ব ডাটাবেজ।
বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, বড় আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মেরুকরণ ঘটে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট বা ১৯৯০ সালের জোটের রাজনীতির সাথে ২০২৬-এর এই ১১ দলীয় জোটের মিল রয়েছে। তবে মাহফুজ আলমের সংশয় এবং নুরের উন্নয়ন ভাবনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের মানুষ এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং গুণগত পরিবর্তন চায়। এনসিপি-জামায়াত জোট সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |