| বঙ্গাব্দ

তৌহিদী জনতা, মব-সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রের নীরবতা: রুমিন ফারহানার অভিযোগে ১৯৫০–২০২৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 25-11-2025 ইং
  • 4824292 বার পঠিত
তৌহিদী জনতা, মব-সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রের নীরবতা: রুমিন ফারহানার অভিযোগে ১৯৫০–২০২৫ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ছবির ক্যাপশন: রুমিন ফারহানা

তৌহিদী জনতার ‘মব-সন্ত্রাসে’ সরকারের নীরব আশ্রয়? রুমিনের অভিযোগে নতুন বিতর্ক

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিএনপির সহ–আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেছেন, দেশে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের ব্যানারে যে মব-সন্ত্রাস ও ধর্মীয় উগ্রতা চলছে, তার পেছনে সরকারের “প্রচ্ছন্ন সমর্থন” আছে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে তিনি বলেন, গত এক বছরে সারা দেশে ৩৬৫ দিনে ৩৮০টির বেশি মাজার ও দরগাহর ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু একটি ঘটনারও বিচার হয়নি; আর এই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না রাষ্ট্র ও সরকার। 

তার এই মন্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘তৌহিদী জনতা’ ও ধর্মের নামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী—যারা কখনো মাজারে আগুন দেয়, কখনো নারী ফুটবলারদের মাঠে নামা ঠেকায়, কখনো আবার অভিনয়শিল্পী বা গায়কদের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি ১৯৫০–এর দাঙ্গা থেকে শুরু করে ২০২৫–এর মব-রাজনীতি পর্যন্ত এক টানা ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ধাপ?


রুমিন ফারহানার অভিযোগ: কারা ‘তৌহিদী জনতা’, কারা তাদের ভিকটিম?

টকশোতে রুমিন ফারহানা বলেন, “তৌহিদী জনতা একেক এলাকায় একেক গ্রুপ অব পিপল হতে পারে। তাদের প্রত্যেকের ওপর সরকারের একটা প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর থেকে একের পর এক মব-সন্ত্রাসের ঘটনায় সরকার নিন্দা জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; বরং নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীগুলোর প্রতি একধরনের বার্তা গেছে—“তোমাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র নামবে না।” 

তিনি দাবি করেন,

  • ৩৬৫ দিনে ৩৮০টির বেশি মাজারে ও সুফি দরগাহে হামলা হয়েছে,

  • একটি ঘটনাতেও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি,

  • প্রথম টার্গেট হচ্ছেন নারীরা—অভিনেত্রী, নারী আয়োজক, সাংস্কৃতিক কর্মী, নারী ফুটবলার,

  • এরপর টার্গেটে থাকছে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু,

  • এমনকি সাবেক সরকারদলীয় ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও হামলা হয়েছে; অনেক বাড়িতে শুধু নারীরাই ছিলেন। 

রুমিনের ভাষায়, “সরকার নিজে অনেক কথা সরাসরি বলতে পারে না, অনেক কাজ প্রকাশ্যে করতে পারে না। তাই তারা চায়, একটা প্রেসার গ্রুপ তাদের হয়ে সে কথা বলুক, সে কাজগুলো এগিয়ে দিক।” তাঁর অভিযোগ, এই গোষ্ঠীগুলোর আইনি নিরাপত্তা, পুলিশের ‘দূর থেকে দেখা’, এবং অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির পরও কার্যকর শাস্তি না হওয়া—সব মিলিয়ে সরকারের সুবিধাই হচ্ছে।

‘তৌহিদী জনতা’ আসলে কী? ইতিহাসের পেছনের পর্দা

তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ‘তৌহিদী জনতা’ কোনো একক সংগঠনের নিবন্ধিত নাম নয়; বরং এটি এক ধরনের ব্যানার বা ছাতা, যার নিচে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠী মূলধারার বাইরে থেকে রাস্তায় নেমেছে। 

  • শব্দের উৎস: ‘তাওহিদ’ আরবি শব্দ, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস; ‘জনতা’ মানে জনগণ। মিলিয়ে ‘তৌহিদী জনতা’ অর্থ—“তাওহিদের অনুসারী জনগণ”।

  • ১৯৭০–এর দশক থেকে ব্যবহার: ১৯৭৫, ১৯৯৭, ১৯৯৮, ২০০১–এর মতো সময়গুলোতে বিভিন্ন ইসলামী সমাবেশ, বিক্ষোভ, ধর্মঘটে ব্যানার হিসেবে এই শব্দ ব্যবহার হয়েছে। 

  • ভোলা ২০১৯: ভোলা জেলার বোরহানউদ্দীনে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ‘মুসলিম তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে মিছিল থেকে সহিংসতার ঘটনা ঘটে; পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়, বহু ঘরবাড়ি ও মন্দির আক্রমণের শিকার হয়। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ব্যানারের অধীনে গোষ্ঠীগুলো—কখনো সরাসরি, কখনো স্থানীয় আলেমদের মঞ্চ ধরে—

  • নারীদের অংশগ্রহণ থাকা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করেছে,

  • নারী শিল্পীদের শো-রুম উদ্বোধনে বাধা দিয়েছে,

  • নারীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট স্থগিতের দাবিতে মাঠে নেমেছে,

  • “অসামাজিক কার্যকলাপের” অভিযোগ তুলে পার্ক, পার্বণ ও ফেস্টিভ্যাল পণ্ড করেছে। 

উইকিপিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ সালে তৌহিদী জনতা ব্যানারের মানুষজনের অংশগ্রহণে—

  • নারী তারকা মেহজাবিন চৌধুরীর এক শো-রুম উদ্বোধন অনুষ্ঠান চট্টগ্রামে ঠেকানো হয়,

  • টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় পরীমনি, ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে অপু বিশ্বাসের অংশগ্রহণে বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া হয়,

  • ঢাকার শাহবাগ থানার সামনে এক নারীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করা অভিযুক্ত ব্যক্তির মুক্তির দাবিতে সমাবেশ হয়, অভিযোগ ওঠে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীকে ভয় দেখানো হয়। 


১৯৫০–২০২৫: মব–সন্ত্রাস, রাষ্ট্রের নীরবতা আর পুনরাবৃত্তি

১৯৫০ ও ১৯৬৪: দাঙ্গা–রাজনীতির সূচনালগ্ন

১৯৫০ সালের পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গা এবং ১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গা—দুটোই ছিল রাষ্ট্রীয় নীরবতা ও মব-হিংসার মারাত্মক উদাহরণ। ১৯৫০–এর দাঙ্গায় হাজার হাজার হিন্দু নিহত হন, শত শত গ্রাম ও উপাসনালয় ধ্বংস হয়; ১৯৬৪–এর দাঙ্গায় ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ অসংখ্য স্থাপনায় হামলা হয়, লক্ষাধিক মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। 

সেই সময়েও উত্তেজনাকর বক্তৃতা, গুজব, মিছিল—এগুলোই ভিড়কে সহিংসতায় ঠেলে দিয়েছে; আর প্রশাসনের দেরি বা পক্ষপাতমূলক আচরণ অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতাকে থামানো তো দূরের কথা, আরও উৎসাহিত করেছে—এমন অভিযোগ সেই সময়কার আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে। 

স্বাধীনতার পর: সংখ্যালঘুদের ওপর বারবার আঘাত

স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মন্দির ও প্যাগোডায় ভাঙচুর, গ্রামে গ্রামে আগুন দেওয়ার পুনরাবৃত্তি হয়েছে; ডিজিটাল যুগে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে রামু (২০১২), নাসিরনগর (২০১৬), ভোলা (২০১৯)–এর মতো ঘটনা দেখিয়েছে—একটি পোস্ট, কয়েকটি উসকানিমূলক বক্তব্য, আর সংগঠিত ভিড় মিলে কীভাবে অল্প সময়ে বহু মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করে ফেলতে পারে। 

হেফাজত, শাপলা চত্বর আর ভিন্ন ধরনের ‘স্ট্রিট পাওয়ার’

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশ এবং পরদিন ভোরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দেখিয়েছে, ধর্মীয় ব্যানারের নিচে সংগঠিত বিপুল জনসমাবেশ রাষ্ট্রের জন্য কত বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। হেফাজত ১৩ দফা দাবিতে প্রকাশ্য ময়দানে আসে; পরে ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ইস্যুতে তৌহিদী জনতার ব্যানারসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সক্রিয়তা আবারও সেই ‘স্ট্রিট পাওয়ার’ ব্যবহারকে সামনে আনে। 


‘তৌহিদী জনতা’ ও নতুন ঢেউ: মাজার, বাউল, নারীরা টার্গেটে

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সুফি দরগাহ, মাজার, বাউল ঐতিহ্য ও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে টার্গেটেড হামলা বেড়েছে—এমনটাই বলছে দেশি–বিদেশি একাধিক মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যম। 

  • আন্তর্জাতিক একাধিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত একশ’রও বেশি মাজার, দরগাহ ও পীরবাড়ি হামলা, অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের শিকার হয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা পড়েনি বা শাস্তি পায়নি। 

  • মানবাধিকার সংগঠন ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা আহমদিয়াই নয়; মুসলিম সুফি ধারার অনুসারীরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। 

  • সাম্প্রতিক একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, গত এক বছরে মব সহিংসতা, লিঞ্চিং, সংখ্যালঘু স্থাপনায় হামলা—সব মিলিয়ে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে; হামলার টার্গেটে রয়েছে সাবেক ক্ষমতাসীন দল–ও তাদের কর্মী–সমর্থকরাও। 

অন্যদিকে বাউল শিল্পী ও মystic singers–দের ওপর হামলা এবং গ্রেপ্তার–বন্দিত্বের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ঢাকার ভেতরে–বাইরে বাউলদের অনুষ্ঠান পণ্ড করা, শ্রোতাদের ওপর হামলা, গায়কদের গ্রেপ্তার—এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফ্যাসিবাদের নতুন মুখ’ বা ‘নীরব তালেবানি জোস’–এর মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। 

ধর্মীয় আড়ালে নারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও আরো স্পষ্ট হয়েছে:

  • নারী ফুটবলারদের ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা,

  • নারী তারকাদের বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে বাধা,

  • বসন্ত উৎসব, নাট্যোৎসব, লালনমেলা–জাতীয় আয়োজনে ‘অশ্লীলতা’ বা ‘অসামাজিকতা’ ইস্যু তুলে চাপ সৃষ্টি—
    এসব ঘটনার একটি বড় অংশেই তৌহিদী জনতা বা ঘনিষ্ঠ ব্যানারের নাম উঠে এসেছে। 


রাষ্ট্র কী করছে, কী করছে না: সমর্থন নাকি নিষ্ক্রিয়তা?

রুমিন ফারহানা বলছেন—এতগুলো ঘটনায় সরকার নিন্দা জানালেও আগাম প্রতিরোধ বা দায়ীদের বিচারে খুব কম অগ্রগতি দেখা গেছে, ফলে গোষ্ঠীগুলো বুঝে গেছে যে রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে না। তার ভাষায়, “আপনি যখন একটা ট্রেন্ড চালু করেন, সেটা আর আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না।” 

মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সংষ্কৃতি ফাউন্ডেশন (MSF)’–এর খুঁজে পাওয়া তথ্যও বলছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ও পরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের হাজারো ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিজস্ব ভূমিকা থেকে শুরু করে মব-হামলা পর্যন্ত নানা মাত্রা রয়েছে; কিন্তু বিচার ও দায় নির্ধারণের হার অত্যন্ত কম। 

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি সুন্নি–সুফি সংগঠন প্রকাশ্য সমাবেশে বলেছে, একশ’র বেশি মাজারে হামলা–সত্ত্বেও সরকার–প্রশাসন দায়ীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, যা আরও নতুন হামলাকে উৎসাহিত করছে। 


১৯৫০ থেকে ২০২৫: পুরোনো স্ক্রিপ্ট, নতুন অভিনেতা?

একটি প্রশ্ন আজ অনেকেই তুলছেন—রুমিন ফারহানার অভিযোগ কি কেবল বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে, নাকি বাংলাদেশের সাত দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেরই ধারাবাহিকতা?

১. মবকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার:
১৯৫০ ও ১৯৬৪–এর দাঙ্গা, ১৯৭১–এর আগে হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক পোস্ট–কেন্দ্রিক দাঙ্গা—এগুলো অনেক ক্ষেত্রে ‘রাস্তার ভিড়’কে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা। 

২. ধর্মীয় ব্যানারে স্ট্রিট পাওয়ার গড়ে তোলা:
হেফাজত–শাপলা চত্বর, ভাস্কর্য ইস্যু, তৌহিদী জনতার সমাবেশ—সব মিলিয়ে দেখা যায়, ধর্মীয় ভাষা, ‘ঐতিহ্যরক্ষা’ বা ‘নাস্তিকতার বিরুদ্ধে জিহাদ’—এসব স্লোগান ব্যবহার করে বড় জনসমাবেশ গড়া হয়েছে, যা কখনো সরকারবিরোধী, কখনো বা সরকারের পক্ষে চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়েছে। 

৩. রাষ্ট্রের দ্বৈত মানদণ্ড:
কোনো সময় সরকার কঠোর হাতে দমন করেছে (যেমন শাপলা চত্বর অভিযান), আবার কোনো সময় একই প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে বা অন্তত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে, বিভিন্ন সরকারের আমলেই। 

৪. নারী ও সংখ্যালঘু—চিরচেনা টার্গেট:
১৯৫০–এর দাঙ্গা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক মাজার–হামলা পর্যন্ত নারী, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি, আহমদিয়া—এই সব গোষ্ঠী বারবার টার্গেট হয়েছে; এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাউল ও সুফি ঐতিহ্য, নারীর ফুটবল ও বিনোদন জগৎও। 


বিশ্লেষণ: রুমিনের অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?

১. বিরোধী রাজনীতির যুক্তি:
বিএনপি ও সমমনা বিরোধী শক্তি বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নিরপেক্ষ নির্বাচন ও ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবহার’ ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেছে। রুমিন ফারহানার বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিক সংস্করণ, যেখানে নিরাপত্তা–ইস্যুর পাশে যুক্ত হয়েছে নারী ও সুফি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মব-সন্ত্রাসের প্রশ্ন।

২. ইন্টারিম সরকারের নৈতিক প্রশ্ন:
শেখ হাসিনা পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা ও ক্ষমতার পরিধি নিয়েও বহু প্রশ্ন আছে; তার ওপর মাজার, সংখ্যালঘু ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর ওপর টার্গেটেড হামলাকে যদি তারা থামাতে না পারে, তাহলে “কাদের স্বার্থে এ নীরবতা”—এ প্রশ্ন আরও জোরালো হবে। 

৩. ধর্মীয় আড়ালে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র:
তৌহিদী জনতা–ব্যানারের অধীনে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা গোষ্ঠীগুলো এখন কেবল মব নয়; তারা স্থানীয়ভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের শক্তি, ব্যবসা–বাণিজ্য ও রাজনীতির ওপরও চাপ প্রয়োগ করছে—সে–ই ইঙ্গিত দিচ্ছে বিভিন্ন ঘটনাচক্র। সরকার যে–ই থাকুক, এই অ–নির্বাচিত, অ–জবাবদিহিহীন “স্ট্রিট পাওয়ার” ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকবে—এটা বলার মতো পর্যাপ্ত সিগন্যাল ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। 

৪. আইন–শৃঙ্খলা বনাম রাজনৈতিক সুবিধা:
রাষ্ট্র যদি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না দেয়, কিংবা তদন্ত–বিচারকে রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশের সঙ্গে বেঁধে ফেলে, তাহলে তাত্ক্ষণিক সুবিধার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে সে নিজেই অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার বন্দী হয়ে পড়ে—এই সতর্কবাণীই ইতিহাস বারবার দিয়েছে। ১৯৫০ থেকে ২০২৫—বাংলাদেশের ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ তার সাক্ষ্য বহন করে। 


সূত্র

১. উইকিপিডিয়া ও গবেষণামূলক নিবন্ধ:
“Towhidi Janata”, “1950 East Pakistan riots”, “1964 East Pakistan riots”, “2013 Shapla Square protests”সহ প্রাসঙ্গিক নিবন্ধ ও রেফারেন্স। 

২. বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা:
কালের কণ্ঠে রুমিন ফারহানার উদ্ধৃতি, মাজার–হামলার পরিসংখ্যান; দ্য ডেইলি স্টার ও অন্যান্য পত্রিকায় সুফি মাজারে হামলা, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও মানবাধিকার সংষ্কৃতি ফাউন্ডেশনের ব্রিফিং; প্রগতিশীল মাজার–হামলা–বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনসমূহ। 

৩. আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও মন্তব্য:
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক USCIRF–এর বাংলাদেশ–সংক্রান্ত ফ্যাক্টশিট; দ্য ইকোনমিক টাইমস, দ্য প্রিন্ট, এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস প্রমুখের প্রকাশিত প্রতিবেদন—Hasina ouster–পরবর্তী ধর্মীয় উগ্রতা, তৌহিদী জনতা–ব্যানারের অধীনে মব-সন্ত্রাস, বাউল–শিল্পী ও নারীর ফুটবল–সংক্রান্ত হামলা ও তাদের প্রতিক্রিয়া। 

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency