| বঙ্গাব্দ

গাজীপুর-১: ইশরাক সিদ্দিকীর হাইব্রিড সাম্রাজ্য; চাঁদাবাজি-দখলবাজির অভিযোগে লন্ডভন্ড কালিয়াকৈর বিএনপি

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 24-10-2025 ইং
  • 2834530 বার পঠিত
গাজীপুর-১: ইশরাক সিদ্দিকীর হাইব্রিড সাম্রাজ্য; চাঁদাবাজি-দখলবাজির অভিযোগে লন্ডভন্ড কালিয়াকৈর বিএনপি
ছবির ক্যাপশন: গাজীপুর-১: ইশরাক সিদ্দিকীর হাইব্রিড সাম্রাজ্য

 গাজীপুর-১ আসনে 'হাইব্রিড' সাম্রাজ্য: ইশরাক সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল ও স্বজনপ্রীতির ভয়াবহ অভিযোগ; লন্ডভন্ড কালিয়াকৈর বিএনপি

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অভ্যন্তরে জেলা কমিটির সদস্য সচিব চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিতর্ক ও কোন্দলের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে কালিয়াকৈরজুড়ে আধিপত্যের এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, যেখানে চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং সালিশির নামে বাণিজ্যের মতো নানা অপকর্ম চলছে। ইশরাকের ছত্রছায়ায় থাকা এই সুবিধাভোগী ও 'হাইব্রিড' নেতারা উপজেলা ও পৌর কমিটিতে পদ পেয়েছেন, অথচ দীর্ঘ ১৬ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও নির্যাতিত ত্যাগী নেতাকর্মীরা হয়েছেন কোণঠাসা।

এলাকার সাধারণ মানুষ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা হয়রানির ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস না পেলেও ইশরাক সিদ্দিকীর অনুসারীদের অপকর্ম এখন 'ওপেন সিক্রেট'। এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু স্থানীয় বিএনপির ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং দলের ভেতরের ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পারিবারিক বিবাদ ও গুরুতর অভিযোগ:

ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে শুধুমাত্র রাজনৈতিক অপকর্মের অভিযোগই নয়, বরং পারিবারিক সম্পত্তি আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে (২০২৪) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তার বড় ভাই চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল এবং বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ইরাদ সিদ্দিকী গুরুতর অভিযোগ করে বলেন:

  • পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ বাধা: ইশরাক আহমেদ চৌধুরী দীর্ঘ ৮ বছর ধরে অসুস্থ পিতার সঙ্গে তাকে সাক্ষাৎ করতে দিচ্ছেন না।

  • সম্পত্তি আত্মসাতের ষড়যন্ত্র: তিনি আশঙ্কা করেন, ভয়ভীতি দেখিয়ে ও ফুসলিয়ে তার ছোট ভাই অসুস্থ পিতার মূল্যবান সম্পত্তি নিজ নামে করায়ত্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন।

  • প্রাণনাশের হুমকি: ইশরাক প্রতিনিয়ত তার জীবনের ক্ষতিসাধন করবে বলে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

‘হাইব্রিড’ পুনর্বাসন ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা:

কালিয়াকৈর উপজেলা ও পৌর বিএনপির কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, তিনি জেলার সদস্য সচিব হয়েই উপজেলা ও পৌর কমিটিতে আওয়ামী লীগের শাসনামলের সুবিধাভোগী, ৫ আগস্টের (২০২৪) পর সক্রিয় হওয়া এবং 'হাইব্রিড' নেতাদের পদায়ন করেছেন।

কালিয়াকৈর পৌর বিএনপি কমিটির বিতর্ক:

গত ১৪ জুন (২০২৪) কালিয়াকৈর পৌর বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠনের পর তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। এই কমিটিতে আওয়ামী দোসর ও মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন করার অভিযোগ তুলে ১৬ বছর আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ও নির্যাতিত-ত্যাগী নেতাদের বাদ দেওয়া হয়। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে পৌর বিএনপির ৬নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেন।

আবেদনে উল্লিখিত বিতর্কিত ও হাইব্রিড নেতাদের চিত্র:

নেতার নামপদবিঅভিযোগের বিবরণ
মাহমুদ সরকারপৌর আহ্বায়কবিগত ১৬ বছর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল উদ্দিন সিকদারের সঙ্গে আঁতাত করে ব্যবসা পরিচালনা। ৫ আগস্টের পর সক্রিয় হয়েই অবৈধভাবে জমি দখল ও জনৈক অটোরিকশাচালককে মারধরের অভিযোগ।
আব্দুল মান্নান দেওয়ানযুগ্ম-আহ্বায়কআওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ঝুট ব্যবসা পরিচালনা। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি। তার পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত (ভাতিজা আশিক দেওয়ান নিষিদ্ধ ঘোষিত উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি)। ৫ আগস্টের পর সুবিধা নিতে সক্রিয়।
মহসিনুজ্জামানসদস্য সচিববিগত ১৬ বছর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কোনো মামলায় নাম নেই। ৫ আগস্টের পর ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে রাজনীতিতে সক্রিয়।
আব্দুর রহমান শেখসদস্যবিএনপির দুর্দিনে জনসম্মুখে বিবৃতি দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। ৫ আগস্টের পর সুবিধা নিতে সক্রিয় হয়েছেন।
তানবীর আহম্মেদসদস্যআওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ।

ত্যাগীদের কণ্ঠ:

উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোকলেছুর রহমান মাস্টার অভিযোগ করে বলেন, "ত্যাগীদের বাদ দিয়ে কমিটি করায় আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছি। যারা জেল খেটেছেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন না করে ৫ আগস্টের পর যারা এসেছেন, তাদের কমিটিতে রাখা হয়েছে।" তিনি টাকার বিনিময়ে কমিটিতে আসার অভিযোগও তুলেছেন।

উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্মসম্পাদক শাজাহান সিরাজ সাজু বলেন, "ইশরাক তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা ও পৌর রাজনীতির ব্যাপক ক্ষতি করেছেন। তার স্বেচ্ছাচারিতায় কোনো কমিটিতে দায়িত্বশীল লোক দেওয়া যায়নি।" জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হযরত আলী মিলনও মন্তব্য করেন, "হঠাৎ সবার সঙ্গে আলোচনা না করে উপজেলা ও পৌর কমিটি বিতর্কিতদের দিয়ে হযবরল অবস্থা করেছে। দলে বিভাজন-বিভক্তি সব হচ্ছে।"

অপকর্মের নেপথ্যে 'ত্রাসের রাজত্ব':

বিভিন্ন সূত্র ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে মাদকাসক্ত ও ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দেখা যায়। এছাড়া স্থানীয়ভাবে জমি কেটে মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িতরাও তার অপকর্মের সহযাত্রী। এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দলের সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।

এদিকে, দল একক প্রার্থী ঘোষণা দেওয়ার আগেই তার মনোনয়ন নিয়ে কর্মীদের মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে ইশরাকের বিরুদ্ধে। কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, সফিপুর ও মৌচাক এলাকায় যুগান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত রিপোর্ট (‘ইশরাকের ত্রাসের রাজত্বে লন্ডভন্ড বিএনপি’) ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পত্রিকা এজেন্টের তথ্যমতে, সংবাদটি 'টক অব দ্য টাউন'-এ পরিণত হওয়ায় সব পত্রিকা আধা ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়।

গাজীপুর-১ আসনের বিএনপি রাজনীতিতে এই অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার ফলে দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে এবং ত্যাগী নেতাকর্মীরা আরও কোণঠাসা হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে।

বিশ্লেষণ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে, বিশেষত বিরোধী দলগুলোর ক্ষেত্রে, দীর্ঘ সামরিক শাসন পরবর্তী সময়ে (১৯৯০ পরবর্তী) দলীয় কোন্দল, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে হাইব্রিডদের উত্থান একটি নিয়মিত সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গাজীপুর-১ আসনে ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিতর্ক কীভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনের সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিএনপির মতো একটি বৃহৎ দলের জন্য, যেখানে ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের মূল্যায়ন সবচেয়ে জরুরি, সেখানে সুবিধাভোগী ও আওয়ামী লীগ-ঘেঁষা নেতাদের পুনর্বাসন দলের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং ভবিষ্যতে জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকি তৈরি করে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে শুদ্ধি অভিযান এবং সাংগঠনিক সংস্কারের যে দাবি উঠেছে, তার বিপরীত চিত্রই কালিয়াকৈর বিএনপি'তে দেখা যাচ্ছে, যা দলের হাইকমান্ডের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।


সূত্র:

১. যুগান্তরে প্রকাশিত ‘ইশরাকের ত্রাসের রাজত্বে লন্ডভন্ড বিএনপি’ শিরোনামের রিপোর্ট।

২. জাতীয় প্রেস ক্লাবে চৌধুরী ইরাদ আহমেদ সিদ্দিকীর সংবাদ সম্মেলন সংক্রান্ত তথ্য।

৩. কালিয়াকৈর এলাকার স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরেজমিন কথোপকথন।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency