জুলাই আন্দোলনের নারী নেতৃত্বকে ঘিরে সংগঠিত অপতথ্য: এক বছরে ৩২টি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ছাত্র গণআন্দোলনগুলোর একটি।
এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—নারী নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
রাজপথের মিছিলে, অনলাইন প্রচারণায়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায়—সব জায়গায় নারী কর্মীদের উপস্থিতি আন্দোলনটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
তবে আন্দোলনের এক বছর পর, এই নারী সমন্বয়ক ও কর্মীদের নিয়ে সংগঠিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে অপতথ্য ও ডিপফেক ভিডিও—যা শুধুমাত্র হয়রানি নয়, রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও ভয় প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার–এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালে জুলাই আন্দোলনের অন্তত আটজন নারী সমন্বয়ক ও কর্মীকে জড়িয়ে ৩২টি ভুয়া তথ্য ও কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের আলোচিত মুখ ফারজানা সিঁথিকে নিয়ে অন্তত ১৫টি ভুয়া ভিডিও অনলাইনে প্রচারিত হয়েছে।
এর মধ্যে মাত্র একটি ভিডিও বাস্তব ফুটেজের বিকৃত রূপ; বাকি ১৪টি কনটেন্ট তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
উমামা ফাতেমা, সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক — ৭টি ভুয়া কনটেন্টের টার্গেট।
নাফসিন মেহনাজ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী — ৫টি অপতথ্যের শিকার।
এর তিনটিতে দাবি করা হয়, তাঁর ‘আপত্তিকর ভিডিও’ রয়েছে—যা সম্পূর্ণ ভুয়া।
সামিয়া মাসুদ মম, তিলোত্তমা ইতি, সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি, এথিনা তাবাসসুম মীম, এবং আনিকা তাসনিমকে জড়িয়ে আরও ৫টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়।
রিউমার স্ক্যানারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
“ভুয়া নাম, পুরোনো ভিডিও ও বিদেশি ছবির অপব্যবহার করে অন্তত ১৬টি অপপ্রচারমূলক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে।”
এর মধ্যে—
৭টি কনটেন্ট এসেছে ভারতীয় অনলাইন সোর্স থেকে,
৩টি অন্যান্য দেশের (মূলত মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান),
এবং বাকিগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে।
এই কনটেন্টগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো ভিডিওকে নতুন পরিচয়ে ব্যবহার করে প্রচারিত হয়—যার সঙ্গে মূল ব্যক্তিদের কোনো সম্পর্ক নেই।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে “রুবাইয়া ইয়াসমিন” নামের এক কাল্পনিক নারী পরিচয়ে ৫টি ভাইরাল ভিডিও প্রচারিত হয়।
রিউমার স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়,
এই নামে কোনো নারী কর্মী বা সমন্বয়ক নেই; ভিডিওগুলিতে ব্যবহৃত ব্যক্তির প্রকৃত নাম যুথী, যিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।
এ ঘটনাকে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে—
“রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নারীকে কেন্দ্র করে সমন্বিত অপপ্রচারের সর্বশেষ উদাহরণ।”
এনসিপি (ন্যাশনাল ক্যাম্পাস প্রোগ্রেসিভস)–এর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন,
“জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাজ করা নারী কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রান্তিক সমাজে অনেকে এসব গুজবকে সত্যি ধরে নেয়, ফলে তাঁদের পরিবার ও সামাজিক অবস্থান হুমকির মুখে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন,
“এটি কৌশলগতভাবে নারীদের ভয় দেখানোর একটি পদ্ধতি। আমাদের মতো প্রকাশ্যে কাজ করা কর্মীরাও যদি এভাবে আক্রমণের শিকার হই, তাহলে অন্য নারীরা আন্দোলন বা রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ হারাবে।”
রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশ্লেষকদের মতে,
এই ধরনের অপতথ্য দুইটি উদ্দেশ্যে পরিচালিত—
১️⃣ আন্দোলনের নারী নেতৃত্বকে সামাজিকভাবে হেয় করা ও ভয় দেখানো,
২️⃣ জনগণের মধ্যে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করা।
তারা মনে করেন, ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন চ্যালেঞ্জ, যা আইনগত কাঠামো ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নীতিমালার ঘাটতি উন্মোচন করছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যালয়ের ২০২5 সালের “Women in Political Movements and Digital Safety Report”–এও বাংলাদেশে নারী কর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়,
“বাংলাদেশ, ফিলিপাইন ও মেক্সিকো—এই তিন দেশে রাজনৈতিক আন্দোলনের নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত অনলাইন সহিংসতা ক্রমবর্ধমান।”
জুলাই আন্দোলনের পর এক বছর কেটে গেলেও নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অপতথ্য ও চরিত্রহননের প্রবণতা অব্যাহত।
এটি শুধু ব্যক্তিগত মানহানি নয়—গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি আঘাত।
মানবাধিকার সংগঠন ও তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলো বলছে, এখনই সাইবার হয়রানি ও ডিপফেক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নইলে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত হবে।
যুগান্তর – “জুলাই আন্দোলনের নারী নেতৃত্বকে ঘিরে অপতথ্যের জোয়ার।”
বাংলাদেশ প্রতিদিন – “ডিপফেক ভিডিও ও অনলাইন হয়রানির শিকার জুলাই আন্দোলনের নারী কর্মীরা।”
রিউমার স্ক্যানার রিপোর্ট (সেপ্টেম্বর ২০২৫) – “Disinformation Targeting Women Coordinators in Bangladesh’s July Movement.”
UN Women / OHCHR (2025) – “Digital Threats Against Women in Politics.”
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |