প্রবাসীদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ঐতিহাসিক মাইলফলক; ১৩তম নির্বাচনে নিবন্ধিত সোয়া দুই লাখ ভোটার
প্রতিবেদকের নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রবাসীদের ভোট: গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য ভোটাধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধনকারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ২৩ হাজার ছাড়িয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিতে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় প্রবাসী ভোটারদের অভূতপূর্ব সাড়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাদের গভীর আস্থারই প্রতিফলন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৭ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা পর্যন্ত অ্যাপটির মাধ্যমে মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৯৯ জন প্রবাসী ভোটার হিসেবে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৫৭৮ জন এবং নারী নিবন্ধিত হয়েছেন ২০ হাজার ১২১ জন। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের সরাসরি অংশগ্রহণের গুরুত্বকে নির্দেশ করে।
বৈশ্বিক সাড়া: কোন দেশে কত নিবন্ধন?
বিশ্বের ১৪৮টি দেশে নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার মাধ্যমে গত ১৮ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তাতে প্রবাসীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। দেশভিত্তিক নিবন্ধনের সংখ্যা ইসির তথ্যে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে:
| দেশ | নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা |
| সৌদি আরব | ৫১ হাজার ৬৪৯ জন |
| যুক্তরাষ্ট্র | ১৯ হাজার ৫৯৯ জন |
| কাতার | ১৩ হাজার ৯৮ জন |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ১২ হাজার ৫০০ জন |
| মালয়েশিয়া | ১২ হাজার ১৬২ জন |
| সিঙ্গাপুর | ১২ হাজার ১৩৩ জন |
| যুক্তরাজ্য | ১১ হাজার ১৯৮ জন |
| দক্ষিণ কোরিয়া | ৯ হাজার ৫১১ জন |
| কানাডা | ৯ হাজার ২৮০ জন |
| অস্ট্রেলিয়া | ৭ হাজার ৯২৪ জন |
| ইতালি | ৭ হাজার ৬০৮ জন |
সময়সীমা বৃদ্ধি ও ইসি’র আহ্বান
প্রবাসীদের সুবিধার্থে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়িয়ে ২৫ ডিসেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত করেছে। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের সুযোগ ছিল।
এ প্রসঙ্গে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, "আউট অব কান্ট্রি ভোটিংয়ের জন্য নিবন্ধনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এখন বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকেই অ্যাপটি ডাউনলোড করে যে কেউ ভোটার নিবন্ধন করতে পারবেন।" তিনি আরও জানান, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে হলে প্রবাসী ভোটারকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করতে হবে। বিদেশে ব্যালট প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ইসি প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি অবস্থানকালীন দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সঠিক ঠিকানা দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ জানিয়েছে। প্রয়োজনে কর্মস্থল বা পরিচিতজনের ঠিকানাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
এছাড়াও, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সরকারি কর্মকর্তা, আইনি হেফাজতে থাকা ভোটার এবং নিজ এলাকা থেকে বাইরে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং (আইসিপিভি) প্রক্রিয়াও চালু করা হবে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৫ দিনের জন্য এই আইসিপিভি’র নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু থাকবে।
১৯৫০ থেকে ২০২৫: গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে প্রবাসীদের অধিকার
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে, যেখানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল জনগণের রায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মূল ভিত্তি। এরপর ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন ও ভোটাধিকার নিশ্চিতের দাবি তীব্র হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও, ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে এই ধারা ব্যাহত হয়। ১৯৯১ সালে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে।
দীর্ঘ এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে (১৯৫০-২০২৫) প্রবাসীরা সবসময়ই দেশের গণতন্ত্রের জন্য সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা ছিল একটি দীর্ঘদিনের দাবি। ৪ জুলাই, ২০২৫ তারিখে ‘প্রবাসী ভোটাধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ, যুক্তরাজ্য’ জাতীয় প্রেসক্লাবের এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও এই অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত তা বাস্তবায়নের দাবি জানায়।
এই প্রেক্ষাপটেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ১২ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে এটিকে দেশের ইতিহাসে এক ‘ঐতিহাসিক মাইলস্টোন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "দেশের সাত থেকে আট শতাংশ মানুষ প্রবাসে বাস করেন। তাদেরকে বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কীভাবে হয়? এটা প্রবাসীদের অধিকার।"
অপরদিকে, ২ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তারেক রহমান প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করায় নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান এবং এই সুযোগকে প্রবাসীদের দেশের প্রতি অবদান ও অধিকারের ‘মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আগস্ট, ২০২৫ মাসে বলেছিলেন যে সরকার প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে কাজ করছে।
বস্তুত, এই অ্যাপ চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ২০২৫ সালে এসে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করল, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রবাসীদের ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বিশ্লেষণ:
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়া বাংলাদেশের নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বৃহৎ একটি গোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সর্বশেষ ধাপ। নিবন্ধনের সংখ্যা ২ লাখ ২৩ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে প্রবাসীরা দেশ পরিচালনার অংশ হতে কতটা আগ্রহী। রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫০ সালের পর থেকে যে ভোটাধিকার ও জনগণের অংশগ্রহণের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, ২০২৫ সালে এসে প্রবাসীদের ভোটদানে সক্ষম করার এই পদক্ষেপ সেই সংগ্রামের একটি সফল পরিণতি। এই উদ্যোগ অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের দিকে বাংলাদেশের যাত্রাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।
সূত্র ও বিশ্লেষণ
সূত্র:
১. নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট (৭ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর পোস্টাল ভোটিং আপডেট)।
২. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) থেকে প্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনার (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এর বক্তব্য (১২ নভেম্বর, ২০২৫)।
৩. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত তারেক রহমান ও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য (নভেম্বর ও আগস্ট, ২০২৫)।
৪. প্রবাসী ভোটাধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ, যুক্তরাজ্য এর সংবাদ সম্মেলনের তথ্য (৪ জুলাই, ২০২৫)।
বিশ্লেষণ প্রতিবেদন কারির নাম:
বিডিএস বুলবুল আহমেদ
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |