বাউল আবুল সরকারকে ঘিরে তৌহিদী জনতার চাপ, রাশেদ খানের ‘কঠোর শাস্তি’ দাবি ও বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননা–রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে কারাবন্দি বাউল শিল্পী আবুল সরকারের মুক্তি নয়, বরং “কঠোর শাস্তি” দাবি করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া সাম্প্রতিক পোস্টে তিনি লিখেছেন—বাউল আবুল সরকারের বক্তব্য সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করেছে; তাই তাকে আইনের সর্বোচ্চ ধারায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
অন্যদিকে বাউলের অনুসারীরা বলছেন, বক্তব্যকে আংশিক কেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; পুরো প্রেক্ষাপট দেখলে বিষয়টি মতবিনিময় ও যুক্তিতর্কের মধ্যেই ছিল, “কটূক্তি” নয়। এ এক দ্বিমুখী টানাপোড়েন—একদিকে ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার দাবি, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিল্পের স্বাধীনতা; যার কেন্দ্রে আজ বাউল আবুল সরকার।
এই ঘটনাকে ঘিরে মাঠে নেমেছে তৌহিদী জনতার অংশবিশেষ, বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন, আবার অন্যদিকে বাম–প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বড় একটি অংশ। ফলে একটি ফৌজদারি মামলা শুধু আইনের বইয়ের ভেতর আটকানো থাকেনি; সেটি দ্রুতই পরিণত হয়েছে দেশের বৃহত্তর রাজনীতি, ধর্মীয় রাজনীতি ও জনমতের সংঘাতের একটি নতুন ইস্যুতে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের ৪ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাবরাখালা এলাকার ‘খালা পাগলী’ মেলাস্থলে পালা গানের এক পরিবেশনায় ইসলাম ও আল্লাহর সৃষ্টিকে ঘিরে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন—এমন অভিযোগ ওঠে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের বিরুদ্ধে। সেই গানের কিছু ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ।
এর পর ১৯ নভেম্বর গভীর রাতে মাদারীপুরের একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান থেকে আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করে মানিকগঞ্জ ডিবি পুলিশ। পরদিন সকালে তাকে মানিকগঞ্জে নিয়ে আসা হয়। একই দিন দুপুরে ঘিওর বন্দরের মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আব্দুল্লাহ ঘিওর থানায় “ধর্ম অবমাননা, ইসলামি বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান” করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিকেলে আবুল সরকারকে মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘিওর থানার ওসি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, অভিযোগে বলা হয়েছে—৪ নভেম্বরের অনুষ্ঠানে তিনি ধর্ম সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন; মামলাটি তদন্তাধীন এবং আইনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন—
আবুল সরকারের বক্তব্য শুনে তিনি মনে করেছেন, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের কটূক্তি করা হয়েছে।
একজন শিল্পীর শিল্পচর্চায় বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই; কিন্তু ধর্ম, আল্লাহ, কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বাসকে অবমাননা করার অধিকারও কারও নেই।
শুধু ইসলাম নয়, হিন্দুধর্মসহ যে কোনো ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে কটূক্তি গ্রহণযোগ্য নয়; বাংলাদেশে সবাই যেন স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার পায়, কিন্তু ধর্মকে উপহাস করার স্বাধীনতা যেন কেউ দাবি না করে।
তিনি আরও লিখেছেন, যারা আবুল সরকারের মুক্তির দাবি করছেন তারা যেন আগে তার বক্তব্য পূর্ণাঙ্গভাবে শোনেন; কারণ তার বক্তব্যে দেশের অধিকাংশ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী তার “যথাযোগ্য শাস্তি” হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করতে সাহস না পায়—এমনটাই তার মত।
এখানে লক্ষণীয়, গণঅধিকার পরিষদ এর আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তৎপরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থানে থেকেছে; আবার একইসঙ্গে তারা ধর্মীয় অনুভূতি এবং সংখ্যালঘু–সংখ্যাগুরু সবার নিরাপত্তার প্রশ্নেও সোচ্চার। ফলে বাউল আবুল সরকারের ঘটনাটি তাদের রাজনীতির জন্যও একটি সংবেদনশীল ভারসাম্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবুল সরকারের গ্রেপ্তারের পর মানিকগঞ্জে “আলেম–উলামা ও তৌহিদী জনতা” ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ শুরু হয়; তাদের মূল দাবি—বাউল শিল্পীর সর্বোচ্চ শাস্তি। একই সময় তার ভক্ত–অনুসারীরাও মানববন্ধন ও মুক্তির দাবিতে অবস্থান নেন।
প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা যায়, ২৪ নভেম্বর জেলার ডাখিন সেউতা এলাকায় জেলা শহরের শহীদ মিনার সংলগ্ন স্থানে তৌহিদী জনতার মিছিল ও সমাবেশের সময় বাউল অনুসারীরা আলাদা মানববন্ধনে দাঁড়ালে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে তৌহিদী জনতার অংশবিশেষ আবুল সরকারের সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়; এ ঘটনায় তিন বাউলসহ চারজন আহত হন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঠিক এ সময়েই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও প্রগতিশীল মহলের বড় অংশ বিষয়টিকে “মব জাস্টিস” বা জনতার হাতে বিচার প্রবণতার ধারাবাহিকতা হিসেবে চিহ্নিত করছে। ভারতের এক ব্যবসায়িক দৈনিকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে—শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তৌহিদী জনতা নামের বিভিন্ন গোষ্ঠী মাঠে নেমে সুফি–বাউল ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও বিভিন্ন মাজারে হামলা বাড়িয়েছে; ২০০–এর বেশি মাজার ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—আইনের হাতে বিচার হবে, নাকি “ধর্মরক্ষার নামে মব”–এর হাতে বিচার—কোনটি চলবে বাংলাদেশে?
বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৯৫–এ ধারায় বলা হয়েছে—কোনো ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে কোনো ধর্ম বা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কথায়, লেখায় বা দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে অপমানসূচক আচরণ করলে তার সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
কেবল দণ্ডবিধিই নয়, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)–এর ২৮ ধারায় “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”–কে অনলাইনে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল সাত বছরের কারাদণ্ড।Centre for Law and Democracy ২০২৩ সালে সমালোচনার মুখে সরকার ডিএসএ বাতিল করে তার জায়গায় নিয়ে আসে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ); কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নতুন আইনও শব্দচয়ন প্রায় অপরিবর্তিত রেখে ২৮ ধারা বহাল রেখেছে—যেখানে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”–এর মতো অস্পষ্ট সংজ্ঞা বহাল আছে এবং শাস্তিও ফৌজদারি আইনের তুলনায় তুলনামূলক বেশি।
যুক্তরাজ্য সরকারের হোম অফিসের সাম্প্রতিক এক বিশদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে—ডিএসএ/সিএসএ ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুভূতি বা অনলাইন মতপ্রকাশের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও হয়রানির প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; রিপোর্টে বিশেষভাবে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাউল শিল্পী শরিয়ত সরকার ও রীতা দেওয়নের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে, যারা “ধর্ম অবমাননার” অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
অর্থাৎ, বাউল আবুল সরকারের মামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ইতোমধ্যেই বিদ্যমান একটি আইনি–রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার সর্বশেষ উদাহরণ, যেখানে “ধর্মীয় অনুভূতি”–র ব্যাপক ও অস্পষ্ট ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের বাউলধারা—খেয়াল, পালা গান ও আধ্যাত্মিক গানের মাধ্যমে—শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এক ধরনের উদার, সমন্বয়ী ইসলামি–লোকজ দর্শন প্রচার করে আসছে। লালন শাহ থেকে শুরু করে বহু বাউল–ফকির দর্শন ও উপমার মাধ্যমে প্রথাগত ধারার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন; এই বিতর্কই তাদের গানের প্রাণ।
কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে ঠিক এই বাউল–ধর্মী গানই বারবার “ধর্ম অবমাননা”–র অভিযোগে মামলার মুখে পড়েছে।
২০২০ সালে মানিকগঞ্জের আরেক বাউল শিল্পী শরিয়ত সরকার কোরআন ও সংগীত প্রসঙ্গে মতামত দেওয়ায় “ধর্ম অবমাননা” অভিযোগে গ্রেপ্তার হন; তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়।
একই বছর নারী বাউলশিল্পী রীতা দেওয়নের বিরুদ্ধে পালা গানের একটি অনুষ্ঠানে “আল্লাহকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য” করার অভিযোগে দুটি মামলা হয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের দাবিও ওঠে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের “সামাজিক শাস্তি” বা মব–প্রেশার তৈরি হয়—যেখানে শিল্পীর বাড়ি বা মাজারে হামলা, চুল কেটে দেওয়া, বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর, এমনকি অনুসারীদের ওপরও হামলা হয়। ২০২৪–২৫ সালের সহিংসতায় সুফি মাজার, ভাস্কর্য ও বাউল ঘরানার মানুষের ওপর হামলা বেড়েছে বলেও আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারও সেই একই ভয়াবহ প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে—প্রথমে অভিযোগ, তারপর মামলা, এরপর তৌহিদী জনতার মিছিল–মানববন্ধন, এবং শেষ পর্যন্ত বাউল–অনুসারীদের ওপর হামলা।
বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ডে ধর্ম ও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা নতুন কিছু নয়; এটির শিকড় অন্তত ১৯৫০–এর দশক পর্যন্ত প্রসারিত।
১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গের দাঙ্গা : গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান)–এর বিভিন্ন স্থানে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, তার সূচনা হয়েছিল ইসলাম অবমাননার অভিযোগ ও গুজব থেকে; যা পরে গ্রাম–শহরজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও গণ–উত্থানের রূপ নেয়।
১৯৬৪ সালের দাঙ্গা : ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের হজরতবল দরগাহ থেকে পবিত্র মোয়ায়ে মুকাদ্দাস (নবীর দাড়ির চুল বলে বিশ্বাস করা হয়) চুরির গুজবের জেরে পূর্ব পাকিস্তনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ হামলা হয়; ঢাকার ধাকেশ্বরী মন্দিরসহ বহু মন্দির ও হিন্দু বসতিতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট ঘটে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১–এর গণহত্যা, ১৯৯০–এর দশকের সাম্প্রদায়িক হামলা, ২০০১ ও ২০১৩–র পর নির্বাচনী সহিংসতা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই “ধর্ম, ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্ম অবমাননা”–কে গুজব ও উত্তেজনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা গেছে।
ডিজিটাল যুগে এসে এই সংঘাত আরও জটিল হয়েছে। ২০১৩–১৪ সালে ব্লগারদের বিরুদ্ধে “ধর্ম অবমাননার” অভিযোগ, ২০১৫–১৬ সালে লেখক–প্রকাশক খুন, ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে নাসিরনগর, রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা—সবগুলোই দেখিয়েছে, একটি ভিডিও, একটি পোস্ট বা একটি গানের অংশবিশেষ কত দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব ও ৫ আগস্টের পরবর্তী সহিংসতায়ও একই ধারা দেখা গেছে—পূর্বের সরকারকে দায়ী করে মূর্তি ও ভাস্কর্য ভাঙচুর, মাজারে হামলা, এবং এখন বাউল–সুফি ঐতিহ্যের ওপর চাপ বাড়া।
অর্থাৎ, বাউল আবুল সরকারের মামলা এবং তাকে ঘিরে তৌহিদী জনতার মিছিল–হামলা—সবই একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক–সামাজিক ধারাবাহিকতার সাম্প্রতিক পর্ব; যেখানে ১৯৫০ থেকে ২০২৫—প্রায় সব দশকেই ধর্মকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, আইনি নিয়ন্ত্রণ ও রাজনীতিকরণ একটি পুনরাবৃত্ত থিম হয়ে আছে।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ইকনমিক টাইমস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে—বাউল আবুল সরকারের গ্রেপ্তারের পর ২৫০ জনেরও বেশি নাগরিক (শিক্ষক–বুদ্ধিজীবী–সাংস্কৃতিক কর্মী) যৌথ বিবৃতিতে ধর্মীয় চরমপন্থার উত্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের ইসলাম–এর একমাত্র প্রতিনিধি প্রমাণ করতে চেয়ে দেশজুড়ে “পরিষ্কার অভিযান”–এ নেমেছে; মাজার ভাঙছে, বাউল ও সুফিদের চুল কেটে দিচ্ছে, নারীদের পোশাক ও চলাফেরায় হয়রানি করছে, সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছে
আইনজীবী সারা হোসেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তুলেছেন—
কেন এমন মামলাগুলো এত সহজে গ্রহণ করা হচ্ছে?
কেন যারা সহিংসতা করছে তাদের বিরুদ্ধেই বরং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বীকার করেছেন—বাউল–সুফিদের ওপর হামলা কোনো এক সরকারের আমলের একক ঘটনা নয়; অতীতেও বিভিন্ন সরকারের আমলে এমন হয়েছে, যা একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ।
এই বাস্তবতায় বাউল আবুল সরকার–কাণ্ডকে অনেকে নতুন ধরণের “ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ”–এর লক্ষণ হিসেবে দেখছেন; আবার অন্য অংশ বলছে—ধর্ম নিয়ে কটূক্তির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে শাস্তির দাবিকে একেবারে খারিজও করা যায় না। দু’পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে তাই একদিকে ইসলামসহ সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিল্পীর নিরাপত্তা ও আইনের শাসনও রক্ষা করতে হবে—এটাই হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ।
১. আইনের স্বচ্ছ প্রয়োগ
অভিযোগ–প্রমাণ–সাক্ষ্য—সব কিছু নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়ে যাচাই করতে হবে; শুধুই ভিডিও ক্লিপ বা সামাজিক গণমাধ্যমের চাপ দেখে বিচার করা যাবে না।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তি হতে হবে আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যেই; কোনোভাবেই মব–চাপ বা রাজনৈতিক চাপ যেন বিচারকে প্রভাবিত না করে।
২. মব–জাস্টিসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
বাউল অনুসারীদের ওপর হামলা, মাজার ভাঙচুর, নারীদের পোশাক নিয়ে হয়রানি—এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে রাষ্ট্রের নীরবতা মবকে বৈধতা দেবে।
৩. আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুদিন ধরেই বলছে—ডিএসএ/সিএসএ–এর ২৮ ধারা ও ২৯৫–এ–এর মতো ধারায় “ধর্মীয় অনুভূতি”–র সংজ্ঞা এতটাই অস্পষ্ট যে, সহজেই ভিন্নমত বা সমালোচনাকে অপরাধ বানানো যায়। তাই ধর্মীয় ঘৃণা ও সহিংসতার উসকানি (incitement)–কে বিচ্ছিন্ন করে কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক স্বাধীনতাকে সুনির্দিষ্টভাবে সুরক্ষিত করার দাবি বাড়ছে।
৪. রাজনীতি ও ধর্মের সুস্থ দূরত্ব
স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে ধর্ম ও ধর্মীয় অনুভূতিকে ভোটের ক্যালকুলেশনে ব্যবহার করেছে। এর ফলে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংবিধান–সিদ্ধ নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; অন্যদিকে ধর্মকেও বারবার রাজনৈতিক কৌশলের যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ের তৌহিদী জনতা–ধর্মভিত্তিক চাপ ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ভেতরেও সেই পুরনো প্রবণতারই নতুন রূপ দেখছে অনেক বিশ্লেষক।
শেষ পর্যন্ত বাউল আবুল সরকারের মামলায় আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে—তা নির্ভর করবে প্রমাণ ও আইনি ব্যাখ্যার ওপর। কিন্তু এই মামলা ও তাকে ঘিরে সহিংসতা বাংলাদেশের ধর্ম–রাজনীতি, মতপ্রকাশের অধিকার এবং আইনের শাসন—এই তিন প্রশ্নকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
রাষ্ট্র যদি একদিকে “ধর্ম অবমাননা”–কে অপরাধ হিসাবে আইন দিয়ে দেখতেই চায়, তাহলে একই সঙ্গে “ধর্মের নামে সহিংসতা, মব–চাপ ও ভিন্নমত দমনের” বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে—না হলে ১৯৫০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত যে সহিংস ধারাবাহিকতা আমরা বারবার দেখেছি, তা ভবিষ্যতেও চলতেই থাকবে।
১. প্রথম আলো (ইংরেজি সংস্করণ) – Baul singer Abul Sarkar jailed in Manikganj on blasphemy allegation; Attack on followers of Baul artiste Abul Sarkar in Manikganj।
২. দ্য ডেইলি স্টার – Baul singer Abul Sarkar sent to jail in case over ‘hurting religious sentiments’।
৩. আইনি ও মানবাধিকার বিশ্লেষণ – End Blasphemy Laws (Bangladesh profile); Amnesty International, Repackaging Repression: The Cyber Security Act and the continuing lawfare against dissent in Bangladesh; UK Home Office, Country Policy and Information Note: Religious minorities and atheists, Bangladesh; Economic Times, Islamist attacks on mystic singers spark sharp reaction in Bangladesh; গবেষণা প্রবন্ধ ও ঐতিহাসিক নথিতে ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা সম্পর্কে তথ্য।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |