নিজস্ব প্রতিবেদক | গাজীপুর | ১২ জুলাই ২০২৫
শ্রীপুরের যুবক মো. শাকিল—একজন সাহসী নাগরিক, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমেছিলেন অধিকার ও ন্যায়ের দাবিতে। কিন্তু সেই দিনটির পর থেকে তার জীবন আর আগের মতো নেই। ৫ আগস্ট গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় কোমরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রায় এক বছর পার হলেও তিনি পাননি উন্নত চিকিৎসা, সরকারি সহায়তা, এমনকি নামও ওঠেনি কোনো সরকারি তালিকায়।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয় শাকিলকে। সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও, তার শরীরে গুলিটি থেকে যায়। চিকিৎসকরা জানান, গুলি অপসারণ করলে শাকিল স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন—এই ঝুঁকি বিবেচনায় গুলি রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই গুলিই এখন তার দুঃসহ যন্ত্রণা আর সীমাহীন আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ।
“আমার লাইফটাই এলোমেলো হয়ে গেছে। আমার সংসারটা এলোমেলো হয়ে গেছে। সব শেষ,” — আক্ষেপ করে বলেন শাকিল।
গুলির কারণে ভারী কাজ করতে পারেন না, ফলে আয়-রোজগার বন্ধ। চিকিৎসা খরচ, ওষুধপত্র, যাতায়াত—সব মিলিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। একমাত্র সন্তানকে নিয়ে স্ত্রীও আলাদা হয়ে গেছেন, কারণ শাকিল এখন চিকিৎসা করাতে পারছেন না।
শাকিলের মতো একজন আহত নাগরিক সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সজীব আহমেদ বলেন, “শাকিলের আহত হওয়ার বিষয়টি আমরা জানি। তবে যোগাযোগের অভাবে তার নাম তালিকায় আসেনি।”
তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিবিসি বাংলায় প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে শাকিলের কষ্টের বিবরণ উঠে আসায়, স্থানীয় ছাত্র সংগঠনের কেউ কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি কাগজপত্রও জমা দেন।
তথ্য যাচাই ও তালিকাভুক্তির দায়িত্বে থাকা রফিকুল ইসলাম রায়হান, যিনি নিজেও একই দিন গুলিবিদ্ধ হন, বলেন, “শাকিল কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু পরে আর যোগাযোগ রাখেননি। হয়তো সে কারণেই তার নাম তালিকায় ওঠেনি।”
অন্যদিকে শাকিলের দাবি, তিনি কাগজপত্র গত বছর একজন ছাত্রের মাধ্যমে জমা দিয়েছিলেন। এরপর আর কেউ যোগাযোগ করেনি।
জুলাই অভ্যুত্থনে আহতদের একাংশ বহুবার সরকারি সহায়তা পেয়েছেন—অন্যদিকে শাকিলের মতো কেউ কেউ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। কেউ কেউ বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ ও ক্যাটাগরি আপগ্রেডের দাবি করছেন, অথচ অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসাও পাননি।
ঢাকার জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালে এখনও কিছু আহত ভর্তি রয়েছেন। কিন্তু অনেকেই বলছেন, তাদের অনেকের হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই, বরং অনিয়ম বা সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার হচ্ছে।
গাজীপুরের রায়হান বলেন, “হাসপাতালের বেড দখল করে রাখা, ভিজিটিং সুবিধা নেওয়া—সবই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আমরা যারা প্রকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা বাদ পড়ছি।”
জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতালের পরিচালক মো. আবুল কেনান বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা আছে, কিন্তু সারা দেশের জন্য চালিত একটি জরুরি হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে কেউ পড়ে থাকলে, সেটি যুক্তিসঙ্গত নয়। প্রয়োজন ছাড়া বেড দখল করে রাখা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।”
মো. শাকিল যেন এখন এক অদৃশ্য লড়াইয়ে আহত সৈনিক—যার শরীরে গুলি, সংসার ভেঙে গেছে, আয়-রোজগার বন্ধ, এবং রাষ্ট্র তার পাশে নেই।
তার প্রশ্ন, “আমি কেন সহায়তা পাব না? আমার অপরাধ কী?”
এই প্রশ্ন শুধু শাকিলের নয়—এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজের প্রতি একটি আহত নাগরিকের মৌলিক প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: শ্রীপুর উপজেলা প্রশাসন, বিবিসি বাংলা, আহতদের সংগঠন, জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল
প্রতিবেদন: বাংলাদেশ প্রতিদিন | বিশেষ অনুসন্ধান বিভাগ | ১২ জুলাই ২০২৫
প্রতিবেদক: BDS
Bulbul Ahmed
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |